রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২০

পারক গল্পপত্র।। শারদ।। ২০২০

   




সম্পাদকের কলম থেকে...

অতঃপর একঘেঁয়ে দিনযাপনে মুক্ত প্রশ্বাসের নিমিত্ত নিজের ভেতরেই উঁকি দিই। যারা এস্কেপিস্ট বলে দাগিয়ে দেবেন, তাঁদের প্রণাম। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, জব্বর গান্ধিগিরিই বটে! অভিযোজিত সত্তাকে দুর্বল মনে ক’রে যারা চেপে বসবেন ভেবেছেন, তাঁদের বলব, কৃত্রিম চর্চার শৌখিন দেখনদারী আমাদের উদ্দেশ্য নয় কখনোই। বাইরেটা কালো, তাই ভেতরটায় আলো ফেলবার চেষ্টা করেছি, এই যা। এ দেখাই কি চরম দেখা নয়! আসলে মোদ্দা কথাটি হল এই যে, সময় ও সমাজের নগ্নতা অন্বেষণে একটা আনন্দ আছে, এতে বোঝা যায়, তুমি কতটা নগ্ন কিংবা তোমার শরীরে কতখানি কাপড় আছে। এ আনন্দ মানে উল্লাস কিন্তু নয়, কেবল ক্ষতের শরীরে খোঁচা দিয়ে ব্যথাগুলিকে যাচিয়ে দেখবার প্রয়াস মাত্র।
 
আমরা আসলে প্রত্যেকেই একেকজন আহাব। আহাব-কে নিশ্চয়ই মনে পড়বে আপনাদের! হারম্যান মেলভিলের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘মোবি-ডিক (দ্য হোয়েল)’-এর নায়ক আহাব, সামুদ্রিক জাহাজ ‘পিকোড’-এর ক্যাপ্টেন। একদিন এক দৈত্যাকার হোয়াইট স্পার্ম তিমি আহাবের হাঁটুর নিম্নাংশ খেয়ে ফেলে। যন্ত্রণাকাতর আহাব কিন্তু দমে যায় নি, প্রতিশোধ নিতে মারিয়া হ’য়ে সমগ্র সাগর-ব্যাপী সেই তিমিকেই অনুসন্ধান ক’রে চলে... 

প্রবহমান সময়ের ‘হিংস্র হা’ আজ যখন গিলতে চাইছে আমাদের, তখন ঘুরে দাঁড়াবার সময় এসেছে... এই অবকাশে ‘পারক’ তার অন্যতম একটি সোপান হ’য়ে উঠবে, এই আশা রাখি। তবে একে যন্ত্রণা-মুক্তির অব্যাজ হেতু বলবেন না নিশ্চয়ই, প্রয়াসটুকুই বৃহৎ...

মা আসছেন... সকলকে শারদ শুভেচ্ছা।
                 
—লতিফ হোসেন




এই সংখ্যার লেখক সূচি ✍  


অমর মিত্র★তপন বন্দ্যোপাধ্যায়★তন্বী হালদার★অনিল ঘোষ★চন্দন চক্রবর্তী★সুকান্তি দত্ত★প্রগতি মাইতি★গৌতম দে★মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস★সুকুমার রুজ★মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য★অরুণ কুমার বিশ্বাস★কৃষ্ণেন্দু পালিত★বিপ্লব বিশ্বাস★আহসান হাবিব★রুখসানা কাজল★প্রবুদ্ধ মিত্র★কাজল সেন★তনুশ্রী পাল★অমিত  মুখোপাধ্যায়★দেবযানী কর সিনহা★হিমি মিত্র রায়★শাঁওলি দে★সায়ন্তনী বসু চৌধুরী★গৌতম রায়★গীর্বাণী চক্রবর্তী★সসীমকুমার বাড়ৈ★রতন শিকদার★সরোজ দরবার★অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী★সুব্রত ভৌমিক★চমক মজুমদার★শ্রীকান্ত অধিকারী★নবনীতা সান্যাল★রাজর্ষি বিশ্বাস★মলয় মজুমদার★কাকলী দেবনাথ★শ্যামল সরকার★বৈদূর্য সরকার★পার্থসারথি রায়★রোমেল রহমান★সঙ্গীতা এম সাংমা★মানস সরকার★আবেশ কুমার দাস★নন্দিনী পাল★অভিজিৎ দাশ★তরুনার্ক লাহা★অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী★জয়িতা ভট্টাচার্য★দীপক আঢ্য★বিজয়া দেব★মধুমিতা সেনগুপ্ত★রাজু বিশ্বাস★অমল কৃষ্ণ রায়★বর্ণালী রায়★সুব্রত হালদার★সৌরভকুমার ভূঞ্যা★দীপালোক ভট্টাচার্য★শৌভিক রায়★সত্যম ভট্টাচার্য★ইন্দ্রাণী সমাদ্দার★সমর সুর★অসিত কর্মকার★নির্মাল্য ঘোষ★দেবাশিস দে★শুভাশিস দাশ★অনুসূয়া সরকার বিশ্বাস★সুবল দত্ত★অংশু প্রতিম দে★বাসুদেব দাস★রবীন বসু★অনুরঞ্জনা ঘোষ নাথ★অরূপম মাইতি★সুবীর ঘোষ★অসিতবরণ বেরা★সুমনা চক্রবর্তী★গোপা মুখোপাধ্যায়★দীপক কুমার মাইতি★রাজেশ ধর★লতিফ হোসেন★সুজয় চক্রবর্তী 


 
 

আহসান হাবিব।। পারক গল্পপত্র



কেথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের প্রতিটি থানায় তার ছবি পাঠিয়ে বলা হয়েছে কড়া নজর রাখতে। শুধু থানায় নয়, দেশের এমন কোন সীমান্ত ফাঁড়ি নেই যেখানে তার ছবি সহ ডিটেইলস পাঠিয়ে বলা হয়নি যেন এই ব্যক্তি কোনমতেই বর্ডার পার হতে না পারে। র‍্যাব তার বাহিনী নিয়ে ভীষণ তৎপর, যে কোন মূল্যে তাকে জীবিত পাকড়াও করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা ঘন ঘন মিটিং এ বসছে, ছক কষছে, সমস্ত দেশে ছকের জাল বিস্তার করা হয়েছে। বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিক ছবি দিয়ে বলা হয়েছে কোনমতেই যেন এই লোক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে। সাদা পোষাকের গোয়েন্দা দল নেমে পড়েছে। রেলস্টেশন, বাস স্টেশন, নদীর প্রতিটি ঘাট এবং ফুটপাতের দিকে নজর রাখছে। দেশের প্রতিটি ভিক্ষুকের প্রতি এমনভাবে নজর রাখা হচ্ছে কাউকে সন্দেহ হলেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।  যেন কোন উপায়েই চোখকে ফাঁকি দিয়ে বিশেষ করে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে। কেননা, ভারত আমাদের এমন প্রতিবেশী দেশ যেখানে একজন ছিঁচকে চোর কিংবা কালোবাজারিকে খুব সহজেই গুলি করে হত্যা করে ফেলে কিন্তু একজন দেশোদ্রোহী ঠিকই বর্ডার পার হয়ে যায় এবং বহাল তবিয়তে বসবাস করতে থাকে। সম্প্রতি শেখ মুজিবের খুনী ক্যাপ্টেন মাজেদ তার উজ্জ্বল প্রমাণ! কি করে এই লোক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বহাল তবিয়তে বছরের পর বছর একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে যেতে পারলো! 


এই প্রসংগেই 'রাষ্ট্রকে বোঝা বড় দায় হে' কথাটা বলে মেশের কাকা চায়ের কাপে চুমুক দিলেন, ঠোঁটে তার সেই হাসি যা ঝুলে থাকে বিদ্রুপের ভংগী হয়ে। এখন শুধু বিদ্রুপ নয়, একটা অবজ্ঞা এবং সবজান্তা ভাব নিয়ে ফুটে উঠেছে। অবশ্য ভাদু কাকা এই ভাবকে কেয়ার করেন না, তিনি মেশের কাকার মুখের উপর বলে ফেলেন-

'রাষ্ট্রকে বোঝা সবচেয়ে সহজ, দেখতে হবে কারা ক্ষমতায় আছে, তাদের মতলব বুঝতে পারলেই রাষ্ট্র বোঝা হয়ে যায়'

মেশের কাকা ভাদু কাকার এই কথায় নড়েচড়ে বসেন, যদিও তিনি জানেন ভাদু কাকু এমন কথা বলতে অভ্যস্ত।

'ধর, এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, শেখ হাসিনা প্রধান মন্ত্রী, তুই রাষ্ট্রকে বুঝে ফেলেিসছ'?

'তার আগে তুই তাহলে বল রাষ্ট্র বোঝা বলতে তুই কি বুঝাতে চাইছিস'?

'ধর এই যে একটা লোক ভারতে পালিয়ে গেলো, সেখানে সে কি করে এতো বছর থাকতে পারলো? কংগ্রেস ছিল, এখন বিজেপি, সব আমলেই তো সে বহাল তবিয়তে ছিল, রাষ্ট্র তাহলে কি? এই ব্যক্তির দ্বারা সব রাজনৈতিক দল কিভাবে সুবিধা পায়'?

'এটা বুঝলি না! এটা হচ্ছে কুটনৈতিক খেলা, পররাষ্ট্রনীতি, এর মধ্য দিয়ে পাশের রাষ্ট্রকে চাপে রাখা'

'তা তুই ঠিকই বলেছিস, এখন বল তো এই যে তাজুল নামের লোকটা সাত সাতটা লোককে খুন করে ফেললো, ব্যাংকের সব টাকা লুট করে নিয়ে চলে গেল, রাষ্ট্র তাকে ধরতে পারছে না কেন'?

'কে বলেছে তোকে রাষ্ট্র ধরতে পারছে না, বল ধরছে না'

এবার মেশের কাকা চুপ করে যান, চায়ের কাপে চুমুক দেন, হাসিটা একটু ম্লান হয়ে আসে, অবজ্ঞার ভাবটা কমে আসে।



দেশের পুরো মিডিয়া ভেংঙে পড়েছে তাজুলের উপর। ক্রাইম রিপোর্টাররা আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে, যদিও এদের প্রধান কাজ তাজুলকে বের করা নয়, তাজুলের ব্যক্তিগত সব কাহিনী রসিয়ে রসিয়ে বলা। এই রসিয়ে বলা গল্পগুলো আম জনতা খায় এবং এসবে মজে থেকে আসল গল্প ভুলে যায়। কয়েকদিন আগে করোনা কেলেঙ্কারিতে ধৃত ডাঃ সাব্রিনার কথা এখন প্রায় সবাই ভুলে গেছে, ভুলে গেছে পাপিয়ার কথা, শামিমের কথা কিংবা সম্রাটের কথা। এখন মাতামাতি চলছে মেজর সিনহাকে নিয়ে। যদিও সিনহা ছাপিয়ে এখন সবার মুখে মুখে উঠে এসেছে শিপ্রা দেবযানীর কথা। এখন হত্যার নায়ক ওসি প্রদীপের কথা ভুলে যাচ্ছে, এখন মুখে মুখে ঘুরছে শিপ্রার কথা। কেন? কারণ শিপ্রা একজন নারী, তার যা কিছু ব্যক্তিগত, সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তার যৌনতার বিষয়গুলি! যেমন কয়েকদিন আগে ডা: সাব্রিনার বেলায় ঘটেছিল। তার পোষাক, তার স্বামীর সংখ্যা, প্রেমিকের সংখ্যা, সেক্স ভিডিও ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়েছিল। পুরুষ ক্রিমিনালের বেলায় এরা খুঁজে বেড়ায় নারী আর নারী ক্রিমিনালের বেলায় খুঁজে পুরুষ! এইসবের ফাঁকে রাষ্ট্র বগল বাজায়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হালকা হয়ে পড়ে! রাষ্ট্র তখন তার ক্ষমতাকে সংহত করার সুযোগ পায় এবং লাগাতার এই খেলা চলতে থাকে।


এই মুহূর্তে দেশের সব মিডিয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে ছুটছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব ব্যস্ত পুলিশ বিজিবি র‍্যাব বাহিনীর প্রধানদের সংগে আলোচনায়। গোয়েন্দা সংস্থার লোকও যোগ দিয়েছে আলোচনায়- একটাই লক্ষ্য যে কোন মুল্যে তাজুলকে গ্রেফতার। 


সভার কাজ শেষ হয়ে বিবিধ বাহিনীর প্রধানরা বেরিয়ে গেলেন, তারা সকলেই চৌকষ, কোন সাংবাদিক তাদের কোন প্রশ্ন করার সাহস দেখাল না। তারা চলে যেতেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো মন্ত্রীর কামরায়। মন্ত্রী সম্ভবত এটাই চাইছিলেন, যদিও তার চোখে মুখে একটা ব্যস্ততার ছাপ তিনি এঁকে রেখেছেন। একটা ফোন এসেছে, মন্ত্রী ফোন ধরলেন..'জ্বী ম্যডাম, জ্বী ম্যাডাম' বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। উপস্থিত সব সাংবাদিক বুঝে ফেললো এটা নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রীর ফোন। সারাকক্ষে একটা নজিরবিহীন পিনপতন নীরবতা, কেননা সাংবাদিকরা যখন কারো সাক্ষাৎকার বিশেষত মন্ত্রি বা কোন সেলিব্রিটির নিতে যায়, একটা ছোট খাটো হাট বানিয়ে ফেলে, শত শত মাইক্রোফোন মুখের সামনে কিলবিল করতে থাকে আর প্রশ্নের বাণ ছুটতে থাকে আর যারা ফটো সাংবাদিক, তাদের অবিরাম ক্লিক চলতে থাকে। একটা বাজার মনে হয়, সাংবাদিকরা খদ্দের আর মন্ত্রী মহাশয় মাছ বিক্রেতা! 

'তাজুলের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি'?

মন্ত্রী কিছু বলার আগেই অজস্র প্রশ্ন আসতে থাকে, মনে হয় উত্তর নয়, প্রশ্নই আসল, মন্ত্রী শুধু প্রশ্ন শুনে যান এবং মুখমণ্ডলে এমন একটি ভাব বজায় রাখেন, যেন তিনি এদের নিয়ে খেলছেন!

'তাজুলের অবস্থান সম্পর্কে কতটুকু জানতে পেরেছেন, মাননীয় মন্ত্রী'?

'তাজুল একজন খুনী, এর আগেও সে খুন করেছে, তার নামে মামলা আছে, সে কি করে ছাড়া পায়'?

মন্ত্রী কোন উত্তর দেন না, প্রশ্ন শুনে চলেন, একদা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান,

'আমি আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেবো, কিছু সময় অপেক্ষা করুন, বিকেলেই বিশেষ সংসদ অধিবেশন বসছে, আমি সেখানেই সব জানিয়ে একটা বিবৃতি দেবো' বলেই তিনি তার কক্ষ থেকে খুব দ্রুত বেরিয়ে পড়েন, পেছনে সাংবাদিকদের দংগল তার পেছন পেছন ছুটতে থাকে, সংগে নানা ধরণের উত্তরবিহীন প্রশ্ন। 


সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে একটি বিবৃতি দিলেন- 'যে কোন মূল্যে খুনী তাজুলকে গ্রেফতার করা হবে। খুনী যেই হোক, ক্ষমা নেই। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভীষণ তৎপর রয়েছে, গ্রেফতার সময়ের ব্যাপার মাত্র'।



অথচ সাতদিন পেরিয়ে গেলো তাজুলের টিকিটিরও সন্ধান পায়নি কোন বাহিনী। এর মধ্যে তাজুলের বাসা থেকে তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ সহ অন্যান্য বহু ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি জব্দ করেছে। তিন বাহিনীর লোকেরা অবাক হয়ে যায় যখন তারা তাজুলের বাসায় একটা জল্লাদখানার সন্ধান পায়। শুধু তাই নয়, এক বিশাল মারণাস্ত্রের সংগ্রহ যখন তাদের চোখে পড়ে, তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তারা অচিরেই বুঝে ফেলে তাজুল কোন যা তা খুনী নয়, নিশ্চয় তার আন্তর্জাতিক কানেকশন আছে, হতে পারে সে বিশাল মাফিয়া চক্রের হোতা। তাকে পাকড়াও করা যে সহজ হবে না, তারা বুঝে ফেলে। ইতোমধ্যেই তাজুলের মোবাইল থেকে তার সব যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই খতিয়ে দেখতে গিয়ে তারা আরো অবাক হয়ে পড়ে যখন দেখে দেশের তাবৎ বড় বড় রাজনীতিবিদদের সংগে তার কথাবার্তার তালিকা। এই সাতদিন সে কারো সংগে কথা বলেছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, কারণ তার নিজের আইডি থেকে কোন ফোন সে করেনি। সব শেষ ফোনটি সে যাকে করেছে, ইতোমধ্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাকে জেরা করে কিছুই পায়নি বলে সংবাদপত্র গুলো খবর ছাপছে। এরই মধ্যে ফেনি শহরে ঘটে যায় এক লোমহর্ষক ঘটনা, প্রকাশ্য দিবালোকে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে ফেনি ডিগ্রী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাগরকে। ঘটনার বিবরণে জানা যাচ্ছে জয়নব নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতো একসংগে দুজন- সাগর এবং সৈকত। মেয়েটিকও নাকি দুজনকেই ভালোবাসতো কিংবা ভালোবাসার অভিনয় করতো। এটা জানাজানি হয়ে গেলে প্রেমিক সৈকত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং কলেজ গেটে সাগর জয়নবকে একসংগে দেখতে পেলে দলবল নিয়ে সাগরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাগরের সংগে তখন জয়নব একই রিকশা থেকে নামছিল । জয়নবের চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটলে সে নির্বাক হয়ে পড়ে, সে সৈকতকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেনি, ফলে জনমনে এই হত্যাকাণ্ড ব্যপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।


'আপনি কি মনে করেন না দেশে আইন শৃঙ্খলা ভেংঙে পড়েছে'?

'একদম না, স্বাধীনতার পর এখন আইন শৃঙ্খলা সবচেয়ে উন্নত এবং স্বাভাবিক আছে'

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর তাৎক্ষণিক জবাব,

সাংবাদিকদের মধ্যে মৃদু হাসির রেখা উঠতে না উঠতেই বাতাসে মিলিয়ে যায়,

'তাজুলকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি কেন'?

'সব প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে, ধরা তাকে পড়তেই হবে'

'পেপার পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাজুল আপনাদের দলের লোক, সব নেতা নেত্রীদের সংগে তার ছবি আছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সংগেও তার ছবি আছে, এটাকে কি বলবেন'?

'দল থেকে তাকে ইতোমধ্যেই বহিষ্কার করা হয়েছে'

আবার একটা মৃদু হাসি অনতিবিলম্বে বাতাসে মিলিয়ে যায়! তারা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে, কোন প্রশ্ন করার কথা তারা ভুলে যায়।



'কি বুঝলি ভাদু? রাষ্ট্রকে বুঝতে পারছিস'?

'খুব পারছি'

'তাজুল কিন্তু ধরা পড়েনি'

'এটাই তো রাষ্ট্র! রাষ্ট্র কাকে ধরবে কাকে ধরবে না, এটাই তুই এখনো বুঝে উঠতে পারলি না রে মেশের, আবার তুই রাষ্ট্র বুঝতে চাস'! কথাটা শোনার পর কেন জানি মেশের কাকার সেই বিখ্যাত হাসিটা আরো বিস্তৃত হয়! 

'তাজুল কি দেশে আছে বলে মনে করেন মেশের কাকা'

আমি প্রশ্নটা করে ফেলি,

'আছে কিংবা নাই, যদি দেশে থাকে, ভাল আছে, নিরাপদে আছে, যদি বিদেশ চলে গিয়ে থাকে, তাও রাষ্ট্র সেটা জানে'

'কাকা, আপনার কি মনে আছে ২১ শে অগাস্ট বোমা হামলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি বলেছিলেন'?

'খুব মনে আছে, উই আর লুকিং ফর শত্রুজ'

ভাদু কাকা, মেশের কাকা এবং আমি এক সংগে হেসে উঠলাম! 

'এরই মধ্যে কিন্তু ফেনিতে আবার প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক ছাত্রকে, কাকা জানেন'?

'নিশ্চয় জানি এবং এও জানি তোদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছে স্বাধীনতার পর নাকি দেশে এতো ভাল আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর কখনো এমন উন্নত ছিল না, ভাদু কি বলবি, এটাকে'?

ভাদু কাকা সেলাই মেশিনে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছিলেন কিন্তু কান এদিকে খাড়া, কাজ বন্ধ না করেই বললেন-

'স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কি এমন ভুল বলেছে শুনি? এমন একটা রেজিম দেখাতে পারবি যখন মন্ত্রীরা আইন শৃংখলা নিয়ে এমন কথা বলেনি'?

মেশের কাকা এবং আমি ভাদু কাকার কথা শুনে চুপ, সত্যিই তো সব সরকারের একই রা।

'শোন' ভাদু কাকা যোগ করেন 'যেখানে মানুষ সেখানেই অপরাধ। উন্নত দেশগুলো কি এর বাইরে? না, তবে তাদের ওখানে বিচার ব্যবস্থা উন্নত, আমাদের এখানে সরকার বিচার ব্যবস্থার উপর আধিপত্য খাটায়, এই যা'! 



সাগর এবং জয়নবের সেক্স ভিডিও এখন সবার মোবাইলে মোবাইলে ঘুরছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন বুঁদ হয়ে এই সেক্স ভিডিও দেখছে। খুনের মোটিফ বদলে গেলো যখন জয়নবের সেক্স ভিডিও সৈকতের সংগেও বেরিয়ে পড়লো। সারাদেশ এখন এই সেক্স ভিডিও দেখতে মেতে উঠেছে, সাত হত্যার খুনী তাজুল এখন মানুষের স্মৃতি থেকে প্রায় উধাও হতে বসেছে। সব ধরণের মেডিয়া এখন সাগর সৈকত জয়নবের যৌনতা নিয়ে নানা গালগল্পে মেতে উঠেছে। সৈকত এখনো পলাতক, তাজুলের মত তাকেও ধরা সম্ভব হয়নি, তবে এটা ঠিক সৈকত ধরা পড়বে। কারণ সৈকতের ছবি এখনো কোন রাজনৈতিক নেতার সংগে দেখা যায়নি।


সারাদেশ তাজুলকে গ্রেফতারের দাবীতে ফুঁসে উঠেছিল, সাগর হত্যার কাহিনী যেন সবাইকে নির্বাক করে দিয়েছে। তারা প্রতিবাদ করতেও যেন ভুলে গেছে। 'অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর' অবস্থা দাঁড়িয়েছে এমন। কিন্তু তাদের জন্য আরো অবাক হওয়া বাকি ছিল। যখন তারা শুনলো কক্সবাজারের পুলিশ একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে গুলি করে হত্যা করেছে। সারাদেশ কেঁপে উঠলো এই ঘটনায় এবং আশ্চর্য এই ঘটনায় কেউ প্রতিবাদ জানলো না


'আচ্ছা বলতো ভাদু, মেজর সিনহা হত্যায় কেন মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামলো না'?

ভাদু কাকা এই প্রশ্ন শুনে মুচকি মুচকি হাসছেন, আমি সেই হাসিতে দেখতে পাচ্ছি এক শ্লেষ যা অচিরেই বেরিয়ে আসবে তার সেই পরিচিত শীতল উচ্চারণের মধ্য দিয়ে,

'এই তুই রাষ্ট্রকে চিনলি মেশের, জনগণকে চিনলি না! আরে জনগণকে না চিনলে তুই রাষ্ট্রকে চিনবি কি করে?'

মেশের কাকার মুখটা সামান্য চুপসে যায়, হাসিটা অবজ্ঞা থেকে অন্য এক ফর্মে রূপ নেয়, সেটা দমে যাওয়া কিংবা আরো শ্লেষাত্মক হয়ে ওঠা বোঝা যায় না,

'তুই বল না শুনি:

'তোর মনে আছে এর আগে তনু হত্যার ঘটনা, ঘটনাটা ঘটেছিল ক্যান্টনমেন্ট চৌহদ্দির ভেতরে, জনগণ এই ঘটনায় ফুঁসে উঠেছিল, কিন্তু সরকার তেমন কোন উদ্যোগ নেয়নি, আজো নেয়নি, কেন নেয়নি? কারণ সরকার আর্মিকে নাড়তে চায়নি, সেটা জনগণের মগজে সেট হয়ে আছে একটা হিংসার রূপ নিয়ে। আজ যখন মেজর সিনহা, হোক অবসরপ্রাপ্ত, তবু যেহেতু আর্মি ট্যাগ লাগানো, তাই জনগণ পথে নামেনি'

'কিন্তু সরকার তো এই ব্যাপারে খুব তৎপর'

'স্বাভাবিক, এখানে সরকার বাধ্য হয়েছে, চাপটা যে আর্মি থেকে আসছে'

'তাহলে তুই কি বলতে চাস দেশ বাহিনীর হাতে পুতুল'?

'এটাই বুঝতে পারিস না, আবার রাষ্ট্র বুঝতে চাস'!

মেশের কাকা এবার একদম চুপ হয়ে যান, আমি এই ফাঁকে রাষ্ট্র বিষয়ক এক অসাধারণ জ্ঞান লাভ করতে থাকি, আমার ভেতরেও অসীম শূন্যতা নেমে আসে।

মেশের কাকা একটা সিগারেট ধরান, এক কাপ চায়ের অর্ডার করেন,

'আমাকে ছাড়াই চা খাবি, মেশের'? বলে ভাদু কাকা জোরে জোরে হেসে ওঠেন, মেশের কাকাও হাসতে থাকেন, দুকাপ নয়, এবার তিনকাপ চায়ের অর্ডার হয়, আমার জন্যও বরাদ্দ হয়।

'তাহলে ভাদু তুই আমাকে বল এই যে মেজর সিনহা  হত্যায় পুলিশকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটার কি ব্যাখ্যা '?

'সহজ' বলে ভাদু কাকা চলে আসা চায়ের কাপে চুমুক দেন, 'পুলিশ অধিকতর সফট ফোর্স, জনগণকে বাগে রাখতে এই গ্রেফতার দরকার ছিল। তুই দেখ ইয়াসমিন হত্যায় কিন্তু পুলিশের ফাঁসি হয়েছিল। তুই দেখাতে পারবি তথাকথিত কোন গণতান্ত্রিক সরকার কোন আর্মিকে জেলে পুরেছে'?

মেশের কাকা ইতিহাস হাতড়াতে থাকেন, মনে হয় খুঁজে পান না, কথাও ফোটে না, নীরব থাকেন। 

'আচ্ছা তুই বলতো তাজুল কি ধরা পড়বে'?

'পড়বে, যখন জন অসন্তোষ থিতিয়ে আসবে, আরো বড় বড় ঘটনায় মানুষ মেতে থাকবে, তখন তাজুল পুলিশ বা র‍্যাবের জালে আটকা পড়বে' বলে ভাদু কাকা তার ঠোঁটে একটা অন্যরকম হাসি ঝুলিয়ে দেন।

'এমন কেন করবে'?

'করবে, কারণ তখন তাজুলকে হ্যান্ডেল করা সহজ হবে আর নতুন নতুন ইস্যুগুলি তাজুলে কিছুটা হাল্কা হয়ে উঠবে। জনগণ ভাববে- না, আমাদের সরকার তৎপর আছে'

মেশের কাকা আর কোন কথা বলার জো পান না, চুপ করে থাকেন। 

আমার ভেতরে অনেক ক্ষণ থেকে একটা উঁকি মারছিল, বলেই ফেললাম-

'আচ্ছা কাকা, এই যে ত্বকী হত্যা হলো, এখন পর্যন্ত কাউকে ধরা হল না কেন, কিংবা সাগর-রুনী হত্যা মামলার কাজ থেমে আছে কেন'?

'এগুলো দলীয় রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিষয়, এখানে ক্ষমতা প্রধান নিয়ামক। এগুলি রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকার চেয়ে দল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্নটা বেশি জড়িত। দলকে দেখতে হয় এসব'

'তাতে তো জনগণের কাছে ভুল বার্তা যায়'

'যায়, কিন্তু দল তাতে কম ক্ষতির মুখে পড়ে। মনে রাখিস দল ঠিক না থাকলে কোন কিছু মোকাবেলা করা সম্ভব নয়'

আমি ভাদু কাকার দিকে অবাক চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকি, মেশের কাকার মুখ থেকে, ঠোঁট থেকে অবজ্ঞা মিশ্রিত হাসিটা তখন উধাও হয়ে সেখানে ঝুলে পড়েছে শ্রাবণের মেঘ! 



আজ সমস্ত মিডিয়ার একটাই হেডলাইন- 'গতকাল গভীর রাতে সাত খুনের আসামি তাজুল ইসলামকে গ্রেফতারের সময় দুপক্ষের গুলি বিনিময় কালে তাজুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারা পড়ে। একজন পুলিশও গুলিবিদ্ধ হয় এবং আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থা আশংকাজনক'। 


 


বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অনুসূয়া সরকার বিশ্বাস।। পারক গল্পপত্র



ভোরের কুয়াশা সরিয়ে স্পস্ট হয়ে উঠছে  পুরনো শহর।

বাসটা ক্রমশঃ পাহাড়পুরের দিকে এগিয়ে আসছে। চারপাশটা অনেক বদলে গেছে।এমনি বৃষ্টি ছিল সেদিন ভোরেও ,যেদিন বিধ্বস্ত অবস্থায় তিন বছরের রাইকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো নম্রতা। একরত্তি মেয়েটা কোল আঁকরে চুপ করে বসেছিল। এতটুকু কাঁদেনি। বরং যেন আগলে রেখেছিল নম্রতাকে।দেখতে দেখতে সতেরোটা  বছর কেটেগেলো।


এই তো দেবীচৌধুরানীর মন্দির। যেদিন  টকটকে লাল সিঁদুর আর লাল বেনারসি পরে প্রথম পা রেখেছিল এই শহরটায় ,সেদিনই  এসেছিলো এখানে প্রণাম করে নতুন জীবনের আশীর্বাদ নিতে।  ভেজা, ভেজা মায়া চোখে লেপ্টে যাওয়া কাজল  আর একরাশ স্বপ্ন ছিল সেদিন। তারপর  তো কত হেরে যাওয়া বিকেলে সে  এসেছে।…

সেই পাকুড় গাছটা!   চার বছরে যতবার এদিকে এসেছে, ততবার খুঁজেছে গাছটাকে। রঙিন থেকে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া জীবনের নীরব সাক্ষী তো এই গাছটাই!

বাসের হর্নে আর স্মৃতির মেদুরতায় কখন যে ব্যাগে মোবাইলটা বাজছে খেয়ালই করেনি নম্রতা।ফোনটা রিসিভ করে বললো

"হ্যাঁ  রে  রাই, এক্ষুনি ও বাড়ী পৌঁছব। সন্ধ্যের আগে ব্যাক করবো কোচবিহারে দিদির কাছে।..দিদান কে দে তো একটু…" 


৩ 

নেতাজী বাস টার্মিনাস থেকে কয়েক পা এগোলেই চৌমাথার মোড়টা। ডান পাশে সরু কানাগলিতে ঢুকতেই  ঐ তো দোতলা হলদে বাড়িটা। সামনের বেগণভোলিয়া গাছটা নেই বলেই কেমন  যেনো ন্যাড়ান্যাড়া লাগছে।  এই তো আর দু পা এগোলেই বিশাল ফটক। কিন্তু পা গুলো কেন অসাড় হয়ে আসছে নম্রতার? অবশেষে সব দ্বিধা কাটিয়ে কলিংবেল বাজাতেই বেরিয়ে এলো এ বাড়ির জামাই দেবেশ। প্রত্যক্ষ আলাপ নেই।

"আরে আসুন ! একা কেনো রাই কোথায়?"

"ওর ক্যাম্পাসিং আছে।"

" . বাপের ভিটে, ঠাকুমা এদের প্রতি অবশ্য আজকালকার ছেলে মেয়েদের তেমন সেন্টিমেন্ট নেই…যাইহোক,

ম্যাডাম তো  এখন কলকাতার ফ্ল্যাটে? ইস্কুলটা কোথায়?আর পেপারে ফিচার টিচার তো লিখছেন খুব …"

"ওই একটু আধটু."!.

" স্কুল ব্যান্ডেলের কাছে।থাকি উত্তর পাড়া । প্রপার কলকাতা নয়। ফ্ল্যাট না,দিদির ননদের বাড়ির নিচতলায় ভাড়া আছি…"

একাই তো থাকা হয় নাকি? বলেই ফিচেল হাসি হাসে দেবেশ।

"একা কেনো? রাই আর মা থাকে। " দৃঢ়ভাবে বলে নম্রতা।


ইতিমধ্যেই দোতলায় এসে পৌঁছেছে নম্রতা। বড়ো বৈঠকখানাটা এখন রোগিণীর শয্যা। বিছানার একপাশে পরে আছে এক কালের দাপুটে বিভা দত্ত। চারদিকে চোখ বোলাতেই নজরে এলো দেয়ালে ঝুল আর ধুলোর আস্তরণের মাঝে ঝুলছে শুকনো ফুলের মালা জড়ানো দীপকের ছবি।

ত্রস্তব্যস্ত হয়ে ছুটে এলো সোনা। এখন বেশ গিন্নী-বান্নি।

"ও  তুমি?এসো এসো ।মা তো ঘুমোচ্ছে।একটু বসো। তোমার জিনিস তো সব আগেই নিয়ে গেছে তোমার মা ,চিলেকোঠার আলমারিতে কিছু থাকলে নিয়ে যেও। আমরা কারো জিনিস আটকাইনা।"

( ডাক -খোঁজের স্বভাব আজও রপ্ত করেনি!)

বলেই ঈশারায় স্বামীকে ডেকে নিয়ে গেলো।

আয়া মাসী বলে চলে " তুমি বুঝি 

বাবুনদার পর্থম বউ! বুড়ি খুব তোমার নাম করতেছে!"

 তার নাম করছে? আশ্চর্য! কয়েক মুহূর্তের জন্য নম্রতা পিছিয়ে গেলো একুশ বছর আগে। তখন সে পাঁচ মাসের গর্ভবতী। রাত প্রায় বারোটা। সব কাজ সেরে ঘুমনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দীপক অফিসের কাগজ পত্র নিয়ে একটু বিচলিত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে বিচলিত আর উত্তেজিত হওয়াটাই  তার প্রকৃতি। নম্রতা বেশি ঘাটাতোনা। হঠাৎই  

রণংদেহি  হয়ে ছেলের ঘরে কড়া নেড়ে  উপস্থিত হলেন বিভাদেবী।

"ও বাবু দেখ !দেখ !তোর বউ আজ ও হলুদের বয়মের মুখ আলগা রেখে এসেছে। আগে একদিন এভাবে চিনি নষ্ট করেছিল,আমি না দেখলে এখনি সব ছিটিয়ে চিত্তির হতো! বলি বিয়ে বাড়িতে গিয়ে কী মেয়ে দেখে পছন্দ করে আনলি? আমার সংসারটা তো গোল্লায় গেল!"..

"নম্রতা !নম্রতা কি শুনছি এসব?

"আসলে … মা বললেন শেষ পাতে সোনা বেগুন ভাজা খাবে ,  তাই তাড়া

 হুড়োয় খেয়াল করিনি…"



"হলুদ কি তোমার বাবা যোগায় নাকি? "

"বাবার নাম  তুলবেনা। উনি নেই…"

"একদম চুপ! মুখেমুখে কথা বললে  জিভ টেনে ছিঁড়ে দেবো।"

"আহ্ লাগছে! চুলটা ছাড়ো! "

"চল হারামজাদী! মা আর সোনার  কাছে ,ক্ষমা   চেয়ে বল তোর মাস্টার বাবা তোকে শিক্ষা দেয়নি! বল!"

" আহ্ লাগছে! ক্ষমা কেনো চাইবো ? ভুল করে হয়েগেছে। ইচ্ছে করে তো...

" চুপ!  আই! সোনা নিয়ে আয় ওর খাতাগুলো! দেখাচ্ছি মজা ! লুকিয়ে লুকিয়ে কাগজে ফিচার পাঠানো?মন সবসময় উরুউরু ! এক্ষুনি সব ছিঁড়ে দেবো।"


"ও বৌদি চা  খাবা গো! ও বৌদি!"

চারুমাসীর ডাকে সম্বিত ফেরে নম্রতার।

একবার শীর্ণ বিভাদেবীর দিকে তাকায়। এই মৃত্যু পথযাত্রীনির শেষ ইচ্ছে পূরণ করতেইতো আসা! 

পাশের লাল সিমেন্টের ঘরটা ছিটকিনি দেওয়া। চারুর অনুমতি নিয়েই ঢুকলো নম্রতা। এখানেই তার খাট,আলমারি ছিল এক কালে! পরে হয় তো রুম্পা ও এখানে থাকতো! এখন বাতিল জিনিসের আখরা হয়েছে। হয়তো বাতিল হওয়া

 সম্পর্কও?  ঘর? না সেভাবে নম্রতা কোনো বরাদ্দ ঘর পায়নি এ বাড়ীতে। বিয়ের পরপরই উঠেছিল নিচ তলার আলো,বাতাসহীন স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই রাই এলো। বাচ্চার ঠান্ডার ধাত থাকায় উপরের লাল সিমেন্টের ঘর বরাদ্দ হলো । কিন্তু সোনার পড়ার সমস্যা হওয়ায় শেষমেষ রাই আর নম্রতার ঠাঁই হলো  ডাইনিং ঘরের  এককোণে কাঠের চৌকিতে। দরজাগুলোর একটাতেও কোনো পাল্লা ছিলনা ।শ্বশুর মশাই নগেন দত্ত তখনও জীবিত ।একে  অ্যলজাইমা তার ওপর ডায়বেটিস।  যতবার তিনি ঘরের ওপর দিয়ে টয়লেটে যেতেন ততবার ছোট্টো রাইকে ফিডিং করাতে নম্রতাকে অস্বস্তিতে পড়তে হতো। হাজার বুঝিয়েও সুরাহা হয়নি। আসলে বিভাদেবী চাননি দীপক আর নম্রতার কোনো ব্যক্তিগত পরিসর থাকুক।  জিনিসপত্র অবশ্যি নিচতলার ঘরেই থাকতো।

একদিন এটাই তার সংসার ছিল! কই এতটুকু টান আসছেনা তো?  নম্রতার ঠাকুমা বলতেন দিনহাটার বাড়িটা ঠাকুমার স্বামীরভিটে।পরপারে যাবার আগে তিনি ভিটে ছাড়বেননা! সেই ঠাকুমার সংস্কারেই  তো বড় হয়েছে সে! স্বামীর ঘর, সিঁদুর,শাখাপলা, নোয়া এসব ভাবলেই ছোটবেলায় প্রতিটা রোমকূপে যেশিহরন জাগতো সেসব যে কোথায় উবে গেল কবে!

ধীরেধীরে জানালার শিক গুলোতে হাত বোলায় নম্রতা। কত বুক ফাটা কান্নায় এই শিকগুলোর ফাঁক দিয়ে এক ফালি আকাশ খোঁজার চেষ্টা করেছে! ডান দিকের সরু দরজাটা খুলতেই চোখে পরে বাঁকানো সিঁড়িটা। ধীরে ধীরে খানিকটা ঘোরের মধ্যেই ছাদে চলে আসে নম্রতা।এই ছাদটার মধ্যেই মরূদ্যান খুঁজে পেত এক সময় সে! গাছগুলো সব শুকিয়ে মরে আছে। চারদিকে পরিত্যক্ত টব।ওই তো  নম্রতার ফেব্রিক দিয়ে রং করা ছোট্টো টবটা  রঙচটে পরে আছে।  আজও মনে পরছে তখন সবে দুদিন বিয়ে হয়ে এসেছে… আপন মনে গাছে জল দিতে দিতেই পাশের বাড়ির ক্যাসেট থেকে ভেসে আসা  "আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে চাও কী , হায় !বুঝি তার খবর পেলেনা!" শুনছিল আর

সুরেসুরে  গুনগুন করছিল, হঠাৎ পেছন থেকে দীপকের ধুপধাপ চটির শব্দ এগিয়ে আসছিল.. কাঁধে দীপকের স্পর্শে চোখ বুজে রোমান্টিকতার কাব্য লিখছিল সে।না কোনো আবেশেই আবিষ্ট হতে পারেনি সেদিন। দীপক জানিয়ে দিল তাদের সবার বাটি,চামচ,থালা,গেলাস আলাদা। দেখে বুঝে নিতে হবে।গুলিয়ে যেনো না যায়।আর সোনার ঘরে বিছানায় ভুলেও নম্রতা যেন না বসে। সোনার এসব পছন্দ নয়। বলেই চলে গিয়েছিল দীপক! অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল নম্রতা! আর গানটা শুনতেই পায়নি! বন্ধই হয়ে গেছিলো নাকি  কে জানে!

 আজও চোখে জল এসে গেল নম্রতার?এখনও?  দীপকের জন্য? ভালোবাসা না পাওয়ার জন্য? নাকি  'স্বামী ' নামক অদেখা ব্যক্তিটির জন্য আশৈশব তিলতিল করে জমানো   এক বুক ভালোবাসার এককণাও দিতে না পারার জন্য? সত্যি কোথায় গেলো ভালোবাসাগুলো যার এক কণা ও এই পরিবারের একটি

 মানুষকেও সে দিতে পারলনা।



"ও বৌদি নীচে চলো গো সবাই ডাকছে! "

"তুমি চারু?কতদিন আছো?"

আমি অনেকদিন। আগে ঠিকা কাজ করতাম।এখন  বুড়ির ডিউটি। "তোমার কথা শুনছি অনেকের মুখেই।"

"কী?আমি খুব খারাপ?'

"ধুর ! মানুষ দেইখে চুল পাকলো !

রুম্পা বৌদিও খারাপ না গো! একটু

 ইসস্টরং! বাবুন দাদা যে কি করলো! বেরেন শর্টের অতগুলা ওষুধ!  তুমি আসো শিগগির,আমি যাই নাহলে ভাববে চুকলি কাটতেছি ।"

ধীরে ধীরে  পা বাড়ায় নম্রতা। চিলেকোঠার কাছে এসে পুরনো কাচের   আলমারিটা চোখে পড়ে। ধুলোয় ধূসরিত।এখানেই হয়তো ঘাপটি মেরে আছে দু একটা পুরনো যাপনের  চিহ্ন।সেই লাল কভার ফাইলটা ,না? , বাঁধন খুলতেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো ছোট্টো রাই আর দীপকের ছবি !বহুদিনের অযত্নে অস্পষ্ট ,সাদা ছোপ ছোপ। এই তো সেই চিঠিটা! যেটা প্রথম দিনহাটায় গিয়ে দীপককে লিখেছিল। বোকা বোকা,সেন্টিমেন্টাল! ঐ প্রথম, ঐ শেষ।  

 ফাইলটা যেনো জোর করে মনেকরিয়ে দিল আঠেরো বছর আগের  দগদগে স্মৃতিটা । 

সেদিন দীপকের বন্ধুর বিয়ে ছিল। দীপক যাবেনা। কথা ছিল নম্রতা সন্ধ্যের আগেই রাইকে নিয়ে হরিদার রিকশায়  যাবে। সুখের উপকরণ এত কম  ছিলযে ছোটছোট জিনিসে সুখ খুঁজে নিতে হতো। দীপক অফিসে বেরিয়ে গেছে।আলমারি  থেকে লাল সিল্কটা বের করে আয়রন করতে গিয়ে দেখে দীপকের কভার ফাইলটা ছিটিয়ে আছে।ধীরেধীরে সব গুছিয়ে আলমারিতে তুলে রাখে নম্রতা। সচরাচর দীপকের  জিনিস  ঘাটার অভ্যাস তার ছিলনা। বিকেলে সব কাজ এগিয়ে ,তৈরি হতে গিয়ে দেখে আলমারি থেকে সব বের করে স্তুপাকার করা। নম্রতার ভালো শাড়িগুলো সিগারেট দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া আর কাঁচি দিয়ে কাটা। দীপকের চোখগুলো  আর ফর্সা গালদুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। নিজেকে সংযত রেখে কি ঘটেছে জানতে চাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই  ঝাঁপিয়ে এসে  চুলের মুঠী ধরে শুরু হয়েগেলো এলোপাথাড়ি কিল, চড়, ঘুসি।  অভ্যাস বশত চেষ্টা করেছিল শান্তভাবে  পাঁচ কান না করে চার দেয়ালে মিটিয়ে নিতে! কিন্তু সেই সময় পাশবিক বলে বলীয়ান হয়ে দীপক এমন ধাক্কা দিল ,যে সে আছরে পরলো লোহার রেলিংয়ের ওপর! তারপর কতক্ষন যে পরেছিল নম্রতা সিঁড়ির নীচে আজ আর মনে করতে পারেনা। হাতটা ফ্র্যাকচার হয়েছিলো।ওই অবস্থায় মেয়েটাকে খাইয়ে  হাত ব্যাগে বাবার দেওয়া গয়নাগুলো ,২০০ টাকা আর রাইএর দু একটা জিনিস  ভরে ,ভোর হবার আগেই চুপিসারে উঠেবসে ছিল কোচবিহারের বাসে। তারপর তো জামাইবাবু সব সামলালো।পুলিশ কেসের ভয়ে মিউটুয়াল ডিভোর্সটা হয়ে গেলো।এরাও ততদিনে ছেলের মানসিক সমস্যা দেখিয়ে গা বাঁচালো। তখনও দীপক দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। ফোনে,চিঠিতে মেরে ফেলার হুমকি দিত। সেই জন্যই দিদি পাঠিয়ে দিল উত্তরপাড়া। সেখানে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি,টিউশনি,আর একের পর এক লড়াই।  

আজ ও ভাবে সেদিন ফাইল থেকে একটা কাগজ খাটের নীচে পড়ে যাওয়ার মাশুল তাকে কিভাবে যে দিতে হয়েছে?  কাগজটা পাওয়াও গিয়েছিলো।কিন্তু কতটা দরকারি ছিল সেটাই তো আর জানা হলনা!


ইতিমধ্যে অনেকেই হাজির।বিভাদেবী বালিশে হেলান দিয়ে বসে।

ছোট কাকিমনি বললেন

"কত দিন পর দেখলাম নম্রতা!  বাবুন চলে যাবার পরও এলেনা? এলেম আছে তোমার। বর ছেড়ে,কলকাতায় গিয়ে চাকরী নিলে,ফিচার লেখালেখি ! এ বাড়ির ছেলেদের মেজাজ তো বরাবরই তিরিক্ষি।আমরা আর পারলাম কই?"



"আপনারাও তো কাকিমা রাইয়ের বাবার খবর যতদিনে জানালেন তখন আসা না আসা এক।কি হয়েছিল সেটাও  বলেননি।"

"কি আর জানাবো বাছা! তুমি মাথা বিগড়িয়ে দিয়ে গেলে ,ওষুধ ধরলো,পরের বউ এসে কোথায় বুঝিয়ে ওষুধ খাওয়াবে তা না ,আরো বাড়িয়ে দিল…. শেষমেষ সেই ওষুধ গুলো একবারে খেয়েই... 

ও সোনা কাদিস না মা!"

"কি করবো বলো কাকিমা! দাদাটা এতো সৎ ছিলনা! আমার মায়ের মত।অন্যায় বরদাস্ত করতোনা। বউ গুলো এমন জুটলো !"

নম্রতার হাসি পাচ্ছিল তবু সংযত হয়ে বললো "এতটাই সৎ ? যে না জানিয়ে বিকারগ্রস্ত ছেলের দুবার বিয়ে দিলেন? হঠাৎই বিভাদেবী বলে ওঠেন

"বৌমা তুমি রাই দিদিকে আনলেনা?ক্যান্সার রোগীটা ফোন করেছিল তাও রাখলেনা কথাটা?"

"পরে আসবে। এখন ক্যাম্পাসিং।"

"আর পরে কি আমি  থাকবো?"

এই বালাটা রাখ।রাইদিদুর বিয়েতে দিও।আর এই শিবলিঙ্গটা রাখ মা।সে মেয়েকে আমি বলতে পারবোনা আর সোনা অত  পারবেনা,

তাই তুমি এর দায়িত্ব নাও।"

গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস নেয় নম্রতা।দেবেশ ইতিমধ্যে দলিল আর জমি_ বাড়ির ম্যাপ নিয়ে হাজির । উকিলী কেতায় বলে চলে

"ম্যাডাম l পুরোবাড়ি আর ফাঁকাজায়গা নিয়ে ৪ কাঠা ৮ছটাক। শ্বসুর মসাই নগেন দত্তের নামে বাড়ী।ওয়ারিশ হচ্ছে,বিভা দত্ত,সোনালী রায়, রুম্পা দত্ত,ছেলে রাতুল দত্ত,আর আপনার মেয়ে রাইমা দত্ত।আপনি তো ডিভোর্সী। এবার আমি রুম্পা বৌদিকে বুঝিয়েছি সরকারি রেটে আমাকে বিক্রি করতে। রাজি হচ্ছেননা।আমি অবশ্য এমন কেস ঠুকে দিয়েছি ও কাউকে বেচতেও পারবেনা।এবার থাকে আপনার মেয়ে।আমরা ভদ্র ফ্যামিলি।রাইকে বঞ্চিত করবনা।আপনারা দানপত্রে কোনো দাবী নেই বলে সই করে দিন। রাই এর বিয়েতে আমরা থােক অ্যামাউন্ট কিছু দেবো। এখন হাত টা খালি…"

আপন মনেই হেসে ওঠে নম্রতা।

দেবেশের দিকে তাকিয়ে  

দৃঢ়ভাবে বলে  "এখন ডিভোর্সী মহিলারও প্রপার্টিতে লিগ্যালি অনেক দাবী আছে।আপনি  বোধহয় জানেননা।"

"মানে… আপনি সহজে মেটাবেননা তাইতো? অত দুর থেকে সব পারবেন?"

"থামুন! আমার কথা শেষ হয়নি।"

বিভাদেবীর দিকে তাকিয়ে বলেন 

"রাই এখন বড়ো হয়েছে। কিছু না কিছু করবেই।ওর বিয়ে নিয়ে আমার কোনো তাড়া নেই। আপনি বালাটা রাখুন।আর শিবঠাকুর আমায় দিচ্ছেন? ভরসা পাচ্ছেন? একদিন তো ঠাকুর ঘরে ঢুকতে 

দিতেননা।যাইহোক ওটা দিতে চাইলে আমি নেবো। এই চেকটা রাখুন সই করা।আপনার ছেলের একটামাত্র এল . আই . সির নমিনি ছিলাম আমি।বাদ বাকি তো আপনি আর সোনা।যখন সব বন্ধন ছেড়ে গেছি তখন এটার জন্য ঋণী থাকতে চাইনা।আপনার চিকিৎসায় লাগবে।৫০,০০০ আছে।"

সবাই একটু মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে দেখে নম্রতা   আরো বলে  "আশা করি  বুঝেছেন সম্পত্তির প্রতি আমার আর রাইএর কোনো আগ্রহ নেই।সম্পর্ক যখন ছিঁড়ে গেছে  তখন প্রপার্টি দিয়ে কি হবে?  যার জন্য আমি প্রাপ্য খোরপোশ টুকু নিইনি। এ বাড়িতে চারবছরে একটাই সম্পদ  পেয়েছি সেটা আমার রাই।যা ,যা সই সাবুদ একটু গিয়ে করিয়ে আনবেন আবার কবে আসবো জানিনা ভালো থাকবেন।"


অনেক দিন ধরেই ওই চেকটা গলার কাঁটার মতো বিঁধে ছিল।আজ ফেরত দিতে  পেরে স্বস্তি হচ্ছে। অনেক ভেবেছে রাইয়ের  অধিকারের কথা।কিন্তু না ।সে রাইকে যোগ্য করে গড়তে পেরেছে।রাই নিজেই নিজের পায়ে দাঁড়াবে।আর যা পরে রইলো তা তো আর্থিক লাভ আর ক্ষতির হিসেব।পুরো জীবনটাই  যার ক্ষতির খাতে চলেগেলো  এগুলো তার  কি সৌভাগ্য এনে দেবে?

সোজা অাসামমোড়ে না গিয়ে ঘুর পথেই গৌরীয় মঠের সামনে অাসে নম্রতা।এখন সুন্দর ব্রিজ হয়েছে। শহরের মাঝ বরাবর তির তির করে বয়ে যাচ্ছে  নিস্তরঙ্গ করলা নদী। ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে  দীপককে লেখা নিজের চিঠিটা বের করে।তারপর টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দেয় করলার জলে। ভেসে যাক সব অতীত,গ্লানি, ঘৃণা । আজ নিজেকে উদাত্ত আকাশের মত মুক্ত মনে হচ্ছে।এই শহরটা বড়ো মায়াবী।না তার জন্মভূমি নয়।স্বামীর ভিটের অনুভূতিও নেই ।তবে বড়ো আপন।অনেক মন কেমন করা মুহূর্তে এই জল শহরের রাস্তা,নদী,গাছ,মন্দির তাকে বলেছে তুমি কেঁদোনা আমরা আছি! এগিয়ে যাও, বাঁচ, হেরোনা। আজ শহরটা আরো ঝকঝকে হয়েছে।কিন্তু আনাচে কানাচে জুড়ে সেই আন্তরিকতা ছাপ আজ ও আছে! ভালো থেকো জল শহর। জানিনা আবার আসবো কিনা। যদি আসি শুধু তোমার জন্যই আসবো। কক্ষনো আমি তোমাকে ভুলবোনা। এই তোমরা আমার কেউ না হয়েও  যে অনেক কিছু!



অনুরঞ্জনা ঘোষ নাথ।। পারক গল্পপত্র



"কে? কে ওখানে?"  মাঝরাতে চমকে উঠে বিছানায় বসে হাঁপাতে হাঁপাতে  চিৎকার করে উঠল সুতপা। শুনতে পেল কে যেন বিড়বিড় করে বলছে সেই কথাটা-যা শুনলে এখনো ওর শিরদাঁড়া দিয়ে স্রোত নেমে যায়, অনুশোচনায় দগ্ধ হয় তার হৃদয়, চোখ দিয়ে নেমে আসে নীরব অশ্রু  ধারা...... তার প্রিয় বন্ধু দেবযানীর থেকে শোনা  শেষ কয়েকটি কথা -"আমায় তুই নোটগুলো সময়মতো একটু দিলিনারে ? দিলেতো আমার স্বপ্নটা পূরণ হত বল।  কেন করলি আমার সঙ্গে এমন? আমাকে না তোর প্রিয়বন্ধু বলে দাবি করতি?তাহলে কেন এমনভাবে আমার স্বপ্নটাকে ভেঙে চুরমার করে দিলি? " অস্ফূট শব্দগুলো রাতের অন্ধকারে সুতপার কানে অনুরণিত হতে হতে সুতপা যেন চলে গেল ২৬ বছর আগে...... 

                   সুতপা চ্যাটার্জী আর দেবযানী দাস  ছিল যেন ধনী-দরিদ্র সমাজের ধনী-দরিদ্র এই দুই শ্রেণীর প্রতিভু -ধনের  অসম বন্টন তাদের বন্ধুত্বে চিড় ধরাতে পারেনি, ইউনিভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই ওরা দারুন বন্ধু। চার্টার্ড একাউন্টেন্ট পিতার একমাত্র কন্যা সুতপা অসম্ভব স্মার্ট ঝলমলে অন্যদিকে সুন্দরবন থেকে পড়তে আসা ক্ষেতমজুর বাবার মেয়ে মৃদুভাষী দেবযানী শান্ত সহজ সরল কিন্তু অসম্ভব মেধাবী। সুতপা যদি সমুদ্রের উচ্ছল ঢেউ হয়তো দেবযানী  শান্ত অতল জলধি। দেবযানী থাকতো কলেজের হোস্টেলে। কিন্তু এহেন  বন্ধুত্বেও চিড় ধরল যখন আজীবন প্রথম হয়ে আসা সুতপা কে হারিয়ে দেবযানী  এম. এ ফার্স্ট ইয়ারে প্রথম হলো।  স্বাভাবিকভাবেই আজন্ম প্রাধান্য পেয়ে আসা সুতপার ভক্তদের ভিড়টা দেবযানী মুখো হতে থাকলো- এতে অবশ্য দেবযানীর খুব একটা হেলদোল ছিল না কারণ ও পড়াশুনা নিয়েই  বেশি ব্যস্ত থাকত। ও জানতো যে ও গরীব ঘরের মেয়ে। ওকে যে করেই হোক নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তাই বাহ্য জগতের বন্ধুত্ব,  তাদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, হাসি, ঠাট্টা করে নষ্ট করার মত সময় তার কাছে ছিল না। সুতপার বন্ধুত্বই তার কাছে অমূল্য বলে মনে হতো,  সুতপাকে সে ভালবাসত প্রাণপণ। কিন্তু এই ঘটনাগুলো সুতপার খারাপ লাগতে লাগলো। যদিও সে দেবযানীকে খুবই ভালবাসত তবুও মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা কাঁটা ধীরে ধীরে বিঁধতে লাগছিল। এর ওপর বন্ধু ইন্দ্রনীল যাকে  সুতপা মনে মনে বেশ পছন্দই করে একদিন যখন গল্পের ছলে সুতপাকে বলল " সুতপা, দেখ, দেবযানী এত শান্ত স্বভাবের মেয়ে আর মিশুকে না হলেও ওর মধ্যে কেমন একটা আকর্ষণ আছে তাই না রে? 

যদিও গ্রামের মেয়ে তবু কি যেন আছে যা ভীষণ ভালো লাগে আমার। " 

" ও বাবা তুই যে দেখছি দেবযানীর  প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস রে ইন্দ্র। "- বলে হো হো করে হেসে উঠে সুতপা ইন্দ্রর  পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। ইন্দ্র "এই না,  না কি সব যা তা বলছিস" বলে সেই মুহূর্তে অস্বীকার করলেও ব্যাপারটা সুতপার বুঝতে আর কিছু বাকি ছিল না। যেহেতু দেবযানীকে সুতপা খুব  ভালোবাসতো তাই এই ঘটনাগুলো প্রথমদিকে অল্প অল্প খারাপ লাগলেও পরবর্তীকালে এই খারাপ লাগাটাই ঈর্ষায় পরিণত হতে থাকলো।  কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও দেবযানীকে সে কথা বুঝতে দিল না। তার পরেই ঘটল সেই দুর্ঘটনাটা। এম.এ পার্ট টুর পরীক্ষার আগে যখন দেবযানী যখন বাড়ি যাচ্ছিল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তার সমস্ত বইপত্র, পরীক্ষার নোটস ইত্যাদি নিয়ে তখন তার ব্যাগ কোনভাবে ট্রেন থেকে চুরি হয়ে যায়।  এককথায় বলা যায় দেবযানী একদম পথে বসে যায়। দেবযানী তার প্রিয় বন্ধু সুতপার কাছে হেল্প চায়, দেবযানী ও সুতপা মিলে যে নোটগুলো বানিয়ে ছিল সেগুলোর  কোন কপি সুতপা কোনভাবেই দেবযানীকে  দেয় না বরঞ্চ বলে নাকি হারিয়ে গেছে।  আসলে বলা যায় ঈর্ষান্বিত সুতপা  তাকে সেইভাবে হেল্প করেনা। মুখচোরা দেবযানীর ইউনিভার্সিটিতে এমন গভীর বন্ধুত্ব আর কারো সঙ্গেই ছিল না। তবুও তার কথা শুনে অন্য বন্ধুরা অল্প হেল্প করলেও তার মূল নোটগুলো না থাকায় সে তার কাঙ্ক্ষিত  মার্ক্স তুলতে পারেনি ফলে তার নেট স্লেট  দেওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। 

জীবনের স্বপ্নগুলো এইভাবে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়াতে দেবযানী  এরপর আত্মহত্যা করে আর তার আগেই তার প্রিয় বন্ধু সুতপাকে  কথাগুলো বলে যায় শেষবারের মতো যা ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সুতপার শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত নামায়.....

                           টিনা, সুতপার মেয়ে এবার এম . এ ফাইনাল দেবে।সুতপার মেয়ে হলেও টিনা স্বভাবে শান্ত, মিষ্টি লাজুক  আরেকটু ভীতু প্রকৃতির কিন্তু পড়াশোনায় ভীষণ সিরিয়াস, একেবারে যেন মায়ের উল্টো ধারার- অনেকটা সুতপার এককালের ভীষণ প্রিয় বন্ধু দেবযানীর মত।  কিন্তু মায়ের সাবজেক্টটাই ওর প্রিয়, সেই ফিলোসফিতেই  ও এম.এ করছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে , খুব ব্যাস্ত টিনা। কিন্তু পার্ট টু পরীক্ষার কদিন আগে টিনার বেস্ট ফ্রেন্ড রূপক একিউট জন্ডিসে খুবই অসুস্থ হওয়ায় ওর বাবামা ওকে হোস্টেল থেকে ওদের বাড়ি রায়গঞ্জে নিয়ে চলে যায়, তার ফলে অনেকগুলো ক্লাস সে করতে পারে না।  তাই সে সুস্থ হয়ে ফিরে এসে টিনার কাছে সাহায্য  চাওয়াতে হেল্পফুল টিনা সব নোটস ও সাজেশনস তাকে দেয়।শুধু তাইনা, নিজের জন্য যে স্পেশাল নোটস সে বানিয়েছিলো তাও রূপককে সে অকপটে দিয়ে দেয়।  রূপক সব জেরক্স করে নিয়ে  টিনাকে ফোন করে জানায়  যে ওর হোস্টেলের একটি বন্ধু দিব্যেন্দুর হাত দিয়ে সিল করা প্যাকেট-এ নোটগুলো টিনাকে ফেরত পাঠিয়ে নিজের বাড়ি রায়গঞ্জে চলে যাচ্ছে সেদিনেরই বিকেলের ট্রেনে।আর নিজের হাতে সময় ছিলনা  বলে বন্ধুর হাত দিয়ে নোটস ফেরত পাঠাচ্ছে বলে ক্ষমা চেয়ে নেয়  টিনার কাছে আর বলে যে, " থ্যাঙ্কস টিনা,  তোর জন্যই আমি পরীক্ষাটা ভালো করে দিতে পারবো,  তোর মত বন্ধু হয় না।"  উত্তরে  সুদর্শন, মিশুকে,  হাসিখুশি রূপককে মনে মনে পাগলের মতো ভালোবাসে চলা অথচ কখনো বলতে না পারা  মিতভাষী টিনা শুধু বলে - " বেশি কথা বললে মার খাবি। তোর না আমি বেস্ট ফ্রেন্ড,  আমি তোর জন্য এটুকুও  করবো না ? তাহলে আমরা বন্ধু কেন? বেস্ট অফ লাক"। " হ্যাঁরে থ্যাংকস। তোকেও 'বেস্ট অফ লাক '। তবে তোকে আর 'বেস্ট অফ লাক' জানাবো কি! তুই তো বরাবরের মতো এবারও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হবি আর আমি হব সেই সেকেন্ড, তাই তোকে আর ওসব জানিয়ে লাভ নেই, বরং তুই আমায় জানা ওতেই কাজ দেবে "- রূপক হাসতে হাসতে বলে ওঠে। 

" বাজে বকিস নাতো। সাবধানে বাড়ি ফিরে যা।" টিনার এই কথার উত্তরে রূপক বলে " ওকে ওকে,  বাট আই মিস ইউ এ লট  মাই লাভলী  ফ্রেন্ড, কতগুলো দিন তোর পিছনে লাগতে পারবোনা আমার দিন কি করে কাটবে বলতো? " টিনা ছদ্ম রাগ দেখায় বলে- "আর বেশি কথা বললে এবার সত্যি গিয়ে তোকে মারবো কিন্তু। "- কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখের কোনটা  চিকচিক করে ওঠে টিনার। 

'দুর্ঘটনা' বা বলা যায় একই ঘটনা পৃথিবীতে বারবার ঘটে শুধু ঘটনার কুশীলব বদলে যায়, এখানেও সেই আগের বারের মতো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। বাসের থেকে নামার সময় একটা ফোন আসাতে  দিব্যেন্দু এমন অন্যমনস্ক হয়ে যায় যে ভুল করে  নোটস এর প্যাকেটগুলো বাসে ফেলে নেমে চলে আসে এবং নোটগুলো সব হারিয়ে যায়। বাস গুমটিতে গিয়ে খোঁজ করলেও কেউ তার খোঁজ দিতে পারেনা। আর নোটগুলো হারিয়ে দিব্যেন্দু সঙ্গে সঙ্গে টিনাকে ফোন করে সে খবর জানায় না। সে বাস গুমটিতে বারবার খোঁজ করতে থাকে এবং টিনাকে মিথ্যে কথা বলে যে  তার বিশেষ অসুবিধার জন্য সে দুদিন নোটগুলো ফেরত দিতে যেতে পারছে না,  দুদিন বাদে গিয়ে সে সব নোট গুলো ফেরত দিয়ে আসবে। এদিকে  দু-তিনদিন পাগলের মতো বাস গুমটিতে খোঁজ করার পরও  নোটস এর দেখা না মেলায় দিব্যেন্দু হাল ছেড়ে দিয়ে শেষে টিনাকে ফোন করে সব কথা জানায়। 

দিব্যেন্দুর কথায় টিনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এখন কী করবে ও?  কিভাবে পরীক্ষা দেবে?  রাগ ও কান্নায় ভেঙে পরে টিনা।  দিশাহারা লাগে, সে ভাবতে থাকে বাবা-মা যদি জানতে পারে যে তার সব নোটগুলো  এভাবে হারিয়ে গেছে তাহলে তাকে কি বলবে তারা? কিন্তু টিনার আর কিছু করার থাকে না। সে তাড়াতাড়ি রূপক কে ফোন করে এসব কথা জানায়, বলে "রূপক জানিস দিব্যেন্দু আমার নোটগুলো  বাসে ফেলে নেমে গেছে আর সব নোটস  হারিয়ে গেছে। এখন আমি কি করব?"  রূপক টিনার কথা শুনে অবাক হয়ে যায়, বলে -  "নেটওয়ার্কের প্রবলেমের জন্য ভালো করে তোদের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।দিব্যেন্দু তো আমায় ফোন করে এসব কথা কিছুই জানালোনা, উল্টে আমার ফোনই ধরলো না তাই ভাবছিলাম যে কি হলো হঠাৎ? এখন তাহলে তুই কি করবি? কিভাবে পরীক্ষা দিবি? তোর সব নোটগুলো এমনকি স্পেশাল নোটস  ও তুই আমায় দিয়ে এত  উপকার করলি, ইশ আমার হাতে যদি সময় থাকতো আমি তোকে নিজে গিয়ে দিয়ে  আসতামরে । ছি! ছি ! কি বিশাল অন্যায় দিব্যেন্দু করল! কী করবি এবার টিনা?  তুই কি করে পরীক্ষা দিবি? এখনতো আর আমার রায়গঞ্জ থেকে ফেরত যাওয়া সম্ভব নয়রে, আর রায়গঞ্জ তো  কলকাতার কাছে নয় যে তুই টুক করে এসে নোটগুলো সব নিয়ে গিয়ে আবার জেরক্স করে নিবি।" টিনা ফোনে খুব কাঁদতে থাকে, বলে "আমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলরে। এখন আমি কি করব?  মা বাবা জানেনা যে তোকে এতসব নোটস আমি দিয়ে দিয়েছিলাম, জানলে কি হবেরে?  নোটস দেওয়াটা বড় কথা নয়, কিন্তু এখন যে আমার কাছে আর কিছুই  রইল না, আমার সর্বনাশ হয়ে গেল রে রূপক। কি করলো এটা দিব্যেন্দু? রূপক তুই যদি নিজে  সব নোটগুলো ফেরত দিয়ে যেতি ভালো হতো রে। তুই নিজে হাতে কেন আমাকে ফেরত দিয়ে গেলি না তাহলে আমার জীবনের এই সর্বনাশ হত না, আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেলরে  রূপক" 

উত্তরে রূপক বলে - "সত্যি রে টিনা, আমি যে অন্য দিন বাড়ি ফেরার টিকিট পেলামনা, পরীক্ষা এসে গেছে তাই আর সময় নষ্ট করতে পারবো না বলেই দুদিনের মধ্যে ফেরত আসার প্ল্যান করে  কলকাতা  গেলাম, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে এইভাবে তোর সর্বনাশ হয়ে যাবে।   তুই কিছু চিন্তা করিস না, আমি তোকে সব নোটস ছবি তুলে মেইল করে পাঠিয়ে দিচ্ছি, আর  হোয়াটসঅ্যাপেও  পাঠিয়ে দিচ্ছি।  তুই পড়ে নে, দেখে নে আর প্রিন্ট আউট বার করে নে, তাহলেই হবে।" "আরে তুই তো পাগলের মতো কথা বলছিস! অত নোটস এর জন্য প্রিন্ট আউট বার করতে  কত খরচা পড়বে বলতো? আর হোয়াটসঅ্যাপে দেখে কি পড়া মুখস্থ করা যায়? এবার আমি কী করব বলতো? বাবা মা জানতে পারলে ভীষণ রাগ করবে? এত প্রিন্ট আউটের খরচাই বা আমাকে কে দেবে  বল?" চিৎকার করে ওঠে  টিনা। প্রচন্ড কাঁদতে থাকে টিনা আর রূপক কে বারবার বলতে থাকে "তোর জন্য আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল রে রূপক তোকে উপকার করতে গিয়ে আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল. " অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে যায় রূপক,  কিন্তু সত্যিই ওর পক্ষে কিছু করা সেই মুহূর্তে আর সম্ভব হয়না। বেডরুমের দরজা আটকে যখন এইসব কথা রূপকের সঙ্গে টিনা ফোনে  আলোচনা করছিল আর চিৎকার চেঁচামেচি করছিল সুতপা দরজার সামনে দিয়ে  যেতে যেতে চিৎকার শুনে  চমকে ওঠে এবং ছুটে যায় মেয়ের কাছে। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে, সুতপা কে সব কথা বলে টিনা কাঁদতে কাঁদতে আসন্ন বিপদের অভিঘাতে অজ্ঞান হয়ে যায়। এসকল ঘটনায় সুতপা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, বাড়িতে ডাক্তার ডেকে টিনাকে সুস্থ করে তোলে. কিন্তু ডাক্তার বলে যান যে টিনার ভীষণ মানসিক আঘাত লেগেছে ওকে যেন  কোন বিষয়ে কোনো চাপ না দেওয়া হয়।

 ওদিকে রূপক মেইল করে সমস্ত নোটস টিনাকে পাঠিয়েও দেয়।টিনার বাবা সব প্রিন্ট আউট নিয়েও আসে টিনার জন্য।  কিন্তু এই সকল নানারকম কাণ্ডকারখানায়  দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন পার হয়ে যায়। ওদিকে পরীক্ষার দিন ক্রমশ এগিয়ে আসতে থাকে। রূপককে মনে মনে  ভালোবাসতো বলেই জীবনের এত বড় ঝুঁকিটা সে নিয়েছিল, চেয়েছিল তার মতো রূপকও  যেন খুব ভালো রেজাল্ট করে। কিন্তু সেই চাওয়া যে তার জীবনকে এইভাবে শেষের দিকে নিয়ে যাবে, তার স্বপ্নগুলোকে ছারখার করে দেবে সে কখনো তা  কল্পনাই  করতে পারেনি। বারবার ক্ষমা চাওয়া সত্ত্বেও রূপককে সে ক্ষমা করতে পারে না। রূপকের প্রতি চরম অভিমান আর অব্যক্ত যন্ত্রণায় তার মনটা দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে যেতে থাকে। আর এই সকল ঘটনা টিনার মনে এমন মানসিক চাপ সৃষ্টি করে যে সে আর সেইভাবে মনঃসংযোগ করে আগামী দিনগুলোয়  প্রস্তুত হতে পারে না। অনিচ্ছাকৃত ঘটনা পরম্পরায় জড়িয়ে পড়ে এমনভাবে সে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায় যে সেখান থেকে বাঁক ফিরে আর পর্বতের চূড়ায় ওঠার  স্বপ্নকে সে সফল করতে পারে না, ফলে বরাবর কলেজে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া  টিনার  ইউনিভার্সিটির ফাইনালে  ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হবার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় আর তারপর ধীরে ধীরে সুগভীর মানসিক অবসাদে সে ডুবে যেতে থাকে। অসহায় সুতাপারা স্বামীস্ত্রী মিলে মনোচিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীর সাহায্যে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় । 

হঠাৎ করে রাতের অন্ধকারে সুতপা আবিষ্কার করে যে কথাগুলো তার বন্ধু  দেবযানী নয়,  পাশে শুয়ে থাকা অসুস্থ মেয়ে টিনাই  বলছে বিড়বিড় করে....


দেবযানী কর সিনহা।। পারক গল্পপত্র




লোকটা সামনে এগিয়ে এল। বলল, দিদি পাঁচ টাকা দেবেন? চা খাব, অনেকদিন চা খাই না।

ওকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মানুষটা কিছুটা চেনা আবার কিছুটা অচেনাও। সারাদিন রাস্তায় ঘোরে, একসময়ে এখানকার বাসিন্দা ছিল। এই উন্মত্ত অবস্থায় প্রথমবার দেখে চিনতে পারছিলাম না।কয়েক বছর আগে হঠাৎ করেই নিরুদ্দিষ্ট হল।তারপর কিছু বছর তাকে দেখা যায়নি। ফিরল যখন একেবারে অন্য রূপে।ভিখিরি বেশ আর মস্তিস্ক বিকৃত। আগের পরিচিতিকে ছাপিয়ে গেছে সে। সারাদিন পথে পথে ঘোরে আর অবান্তর কথা বলে। কাকে কী বলে কেন বলে তা বোঝা মুশকিল।পারতপক্ষে কেউ কাছে যায়না।কেউ তাকে মানুষও ভাবেনা। তবে কিছু সহৃদয় লোকজন এখনো আছেন যাঁরা তাকে দেখলে করুণা করেন।


এখন  আচমকা সামনে এল, 

কে? ও আপনি! অবাক হয়েছি একটু ঘাবড়েও গেছি। এত সামনে চলে এসেছে যে ওর কথা না শুনে উপায় নেই।

হামেশাই রাস্তায় ঘুরতে দেখি কিন্তু কথা তো হয়না। কথা বলার দরকার কী।মেইন রাস্তা ধরে প্রতিদিন দু একটি পাগল, ভিখিরি, ফেরিওয়ালা, সাধারণ মানুষ যে কেউ চলে যায় নিজেদের গন্তব্যে। কে কাকে চেনে।ভাবলাম চেয়েছে তো মাত্র পাঁচ টাকা।যদিও পাঁচ টাকা আমার কাছে নেই।  দিলাম দশ টাকা,হাতেই টাকাটা দিলাম। ও কথা না বাড়িয়ে অন্য দিকে চলে গেল।ও অন্যদিকে চলে যেতে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাচঁল।


অথচ এই লোকটা একদিন সুস্থ ছিল। আমাদের বাড়িতে এলে ওদের পরিবারের গল্প করত। ওর স্ত্রী সন্তান সব থাকা সত্ত্বেও আজকে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।এটা সত্যি মর্মান্তিক।চেহারাটা অনেক বদলে গেছে। এখন কিছুই আর মনে নেই ওর, একটু আগেই আমি যখন ওর সঙ্গে কথা বলছিলাম আশেপাশের অনেক লোক আমার দিকে খুব সন্দেহজনক দৃষ্টি নিয়ে দেখছিল। কেউ বিরক্ত হয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল এর একটা কারণ অবশ্যই আছে, ও যে উন্মাদ!এদেরকে লোকে সহজে বিশ্বাস করবে না। যদি খিঁমচে দেয়  কামড়ে দেয়। প্রাথমিকভাবে এই ভয়টাই আসে। একবার শুনেছিলাম একটা উন্মাদ পাড়ার এক যুবতী মেয়েকে লোকজনের সামনেই জড়িয়ে ধরেছিল। মেয়েটা তখন ভয়ে লজ্জায় ঘৃণায় আধমরা হয়ে গেছিল। অনেকে মিলে বাঁচাল সেদিন ওই মেয়েটাকে। এই ঘটনাটির জন্য,ভয় কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে অনেক সময় লেগেছিল মেয়েটার।

কখন কী বলবে কী করবে তার ঠিক নেই বলে

সাধারণ মানুষরা এদের দেখলেই তাড়াতাড়ি পালিয়ে যায়। তবে সব পাগল কিন্তু মারপিট করেনা বা ক্ষতি করেনা। তবুও সাধারণ মানুষ ওদের ভয় পায়।আগেও দূর থেকে দেখে মনে হয়েছে এই মানুষটা ততটা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেনি।এর মাঝেই এই জায়গায় চারিদিকে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন চলতে থাকে। যে যার নিজেদের উদরপূর্ণ করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায়।এরা একটা সমাজে আবর্জনা হয়ে বেঁচে থাকে।


নোংরা পোশাক, ধুলোভর্তি মাথায় ধূসর চুল জট পাকিয়ে গেছে। কত বছর স্নান করেনা। সামনে এলে বিশ্রী গন্ধে গা গুলিয়ে উঠবে এমন লোককে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষরা এড়িয়ে যাবে এটা স্বাভাবিক। ওর সঙ্গে বাক্যালাপ করবে কে? মাঝে মাঝে এদের জন্য খুব খারাপ লাগলেও কিছু করতে পারবনা ভেবে চুপ করে থাকি। 



ওকে দেখার পর বারবার মনে হতে লাগল সেই লোকটার কিকরে এরকম অবস্থা হল। তারপর যা হয় আস্তে আস্তে ভুলে গেলাম। এই এলাকার লোক যাবে কোথায়,যখনই কোনো কাজে বাইরে বেরাই দেখতে পাই। কিছুদিন পরে আবার দেখা হল।

 এদিন দোকান থেকে কিছু জিনিস কিনে বেরিয়ে আসছি হঠাৎ দেখি পেছনে দাঁড়িয়ে। লোকটা দাঁত বের করে হাসছে। পেটে ক্ষুধার পাহাড় কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই।লম্বা সুঠাম চেহারা। তবে আজকে কিছুটা পরিচ্ছন্ন লাগল ওকে। চুল দাঁড়ি কেটে একেবারে ভদ্রলোক হয়ে ঘুরছে। কিন্তু সারাক্ষণ নিজের মনে বকবক করে যাচ্ছে ।সবসময় কথা বলতে থাকে কিন্তু কী বলে কেউ বুঝতে পারেনা। ওর কথা জড়িয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও কথাগুলো বোঝা যায়না। একটু আগেই দোকানপাট খুলে দোকানদাররা সব সাজিয়ে গুছিয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় আছে,  ওকে দেখেই দোকানি ধমকের সুরে বলল, কী হল যা যা, আবার কী চাই, রোজ রোজ কী চাইতে আসিস বলতো। এখন দিতে পারবনা! বিরক্ত হয়ে দুচারটে খুব খারাপ গালি দেয়। যা যা পরে আসবি বলে কুকুরের মতো ওকে প্রায় তাড়িয়ে দিল দোকানদার। ততক্ষণে আমার কেনা হয়ে গেছে। ও করল কী তাড়া খেয়ে দোকানের সামনে মেইন রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। কত গাড়ি যাচ্ছে ওর হুঁশ নেই।ওর নাম বাদল।নামটা আমিও ভুলে গেছিলাম কেউ ওই নাম ধরে বলছিল, সরে যা গাড়ি চাপা পড়বি। কে বলছিল ভীড়ের মধ্যে দেখা গেলনা।


আমিও পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলাম আবার কী মনে করে দোকানে গিয়ে ঢুকলাম। একটা পাউরুটি একটা বিস্কিটের প্যাকেট কিনে এসে ওর হাতে দিই। দোকানদারের কাছে তাড়া খেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। এক মুহূর্ত দেরি না করে ওখানে দাঁড়িয়েই পাউরুটির প্যাকেটটা ছিঁড়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। ওকে দেখিয়ে দোকানি বলল এই দিলেন, ব্যস এরপর  দেখবেন রোজ আপনার কাছে চাইবে।সেদিন কোনো উত্তর না দিয়েই চলে আসি, এমনিতে বেশি কথা বলতে ভালোলাগেনা।একেকটা মানুষের চিন্তা ভাবনা আর অভিজ্ঞতা আলাদা হয়। ভাবলাম লাখ লাখ টাকা চাইছে না! একটু খেতে চায়। এটুকু দিতে দোষ কোথায়। এমনিতে ও ততটা ভায়োলেন্ট না।কারোর ক্ষতি করছেনা। মনে মনে ভাবলাম সব দোকানদার আপনার মতো ভাবেননা তাঁরা বেঁচে থাকা খাবার ওকে দেন নাহলে সে বেঁচে আছে কিকরে?সব জায়গায় এমন কোনো সংস্থা নেই যারা এদের নিয়মিত দেখভাল করবে।দুচারদিন বাদে আবার হঠাৎ দেখতে তাকে দেখতে পেলাম।সেদিন একটু তাড়াও ছিল। আনমনে হেঁটে যাচ্ছি, কে যেন পেছন থেকে ডাকছে। স্বর শুনেই বুঝতে পেরেছি কে? আমাদের এখানে কোয়াটারের দুপাশে কোথাও কোথাও ঘন জঙ্গল, প্রচুর গাছপালা আছে। একেকসময় মনে হয় প্রকৃতিকে দুহাত উজাড় করে দিয়েছে। মানুষের বৈচিত্র্য, বিভিন্ন প্রকারের পাখি পোকা মাকড় সাপ কুকুর বিড়াল সব আছে।মালভূমির বিচ্ছিন্ন অংশে উঁচু নিচু পথে পলাশের রংয়ে সেজে ওঠে এই ক্ষুদ্র টাউনশিপ। এখানে দেখবার মতো বসন্তকাল। অন্যান্য ঋতুও সুন্দর। তাই সুযোগ পেলে আমিও ঘুরি,ওর মতই ঘুরে বেড়াই এখানে ওখানে। ওই উন্মাদ মানুষটার মতো ঘুরি কিন্তু একা একা এত কথা বলিনা। এই যা পার্থক্য! 


দেখলাম একটা গাছের আড়ালে চুপ করে বসে আছে। ঝুঁকে থাকার ভঙ্গিটা দেখে মনে হচ্ছে ঝোপে ঝাড়ের ভেতর খুঁজছে কোনো মূল্যবান জিনিস। 


ওকে দেখে আমি দাঁড়িয়ে পড়েছি। কৌতূহল দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। আসলে আমি জানতে চাই এমন হল কেন আর ওর ভেতর কিছু গুণ আছে যেটা ইম্প্রেসেড করবেই। ওর এই দুরাবস্থার জন্য কে দায়ী বুঝতে চেষ্টা করি।


আমাকে দেখেই বেরিয়ে এল। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল দিদি ভালো আছেন? এই কথাটা বেশ কয়েকদিন ধরে জিজ্ঞেস করে, শুনে চমকে উঠি।দেখেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল যখন

বললাম কী খুঁজছেন? পেলেন? কিছু খুঁজে না পাওয়ার জন্য মনে মনে 

খুব বিরক্ত হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। ও অস্থির,অস্বস্তি নিয়ে জবাব দেয় 

,-না না সব খেয়ে চলে গেছে রাক্ষুসী শালী। আমার পাঁচ বছরের মেয়েকে খুঁজছিলাম ঝোপের মধ্যে।


শুনে শিউরে উঠি, বলে কী? এইজন্য মাথা খারাপ লোকদের থেকে দূরে থাকে সুস্থ মানুষরা। আহারে,মেয়েকে নিশ্চয়ই দেখতে ইচ্ছে করে। ওর ফ্যামিলি এখন কোথায় আছে কেউ জানেনা। ওরা বাদলকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। চিকিৎসাও করায়নি।পাগল হয়ে গিয়ে সবকিছু ভুলে গেছে কিন্তু ওর ফ্যামিলি একবার তো আসতে পারে। মানসিক রুগীদের জন্য যে হাসপাতাল সেখানে ভর্তি করাতে পারে।ও বলল,


-দেখলাম,যা ছিল সব গায়েব। কত খুঁজব আর।উপরের দিকে তাকিয়ে দেখাল কিছু, বুঝলাম প্লেন পাখি ইত্যাদি দেখাল। না না হয়তো অন্য কিছু বোঝাতে চাইল। ওর কল্পনার কূল কিনারা করতে পারবনা জানি তবু আমি নাছোড়, জানতে হবে। আগের কথায় ফিরে গেলাম, বললাম, কী হয়েছে? রাক্ষুসী কে? কোথায় থাকে আপনার রাক্ষুসী?ও বলল

রাক্ষুসী না ভুল বললাম বেইমান।রাক্ষুসীর দয়া মায়া থাকে। তারপর ভ্রু কুঁচকে এমন একটা ভাব প্রকাশ করল যেন এটা কিছুইনা। মামুলি সমস্যা। ও নিজের মতো ভালোই আছে। ওরা

অনেকদূরে চলে গেছে। ওর দুহাতে গাছের ডাল আর কিছু পাতা শেকড়বাকর দেখে জানতে চাইলাম ওগুলো কী?

বলতে পারলনা, তোতলাচ্ছিল খুব, ওগুলো নিম গাছের ডাল । বিরবির করল নিম বিম ডিম।


'ভাতের ফ্যান, রুটির ফ্যান, ঘরের ফ্যান'


এ সুস্থ হলে কবিতা লিখে ঝড় বইয়ে দিত! এদিনও অন্যবারের মতই আবার খুব ব্যস্ততা কে  বলবে সায়েন্স গ্রাজুয়েট, পড়াশোনা করার অভ্যাস ভালোই ছিল। ভোটের আগে চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন কোনো না কোনো দলের হয়ে ভাষণ দেয়। কেউ শোনেনা। গ্রাহ্য করেনা।

তখন বিড় বিড় করে যা বলল কিছুই বুঝিনি।


সেদিন শুধু বুঝলাম এই ভয়ঙ্কর পরিণতির পেছনে বিরাট কাহিনী লুকিয়ে আছে। একটা মানুষ এমনি এমনি সোজা পথ থেকে ছিটকে পড়েনা।আমি ওর সঙ্গ নিলাম, দেখি কোথায় যায়। হাসিটা অমায়িক।আশ্চর্য ব্যাপার যখনই দেখা হয় বলে, ভালো আছেন? আমি খুব খুশি হই ওর এই কথাটায়। এটা শুনতেই ওকে দেখলে এড়িয়ে যাইনা।


কোথায় থাকেন আপনি? দুজনেই পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি।বলল,দূরে অনেক দূরে। কোনো কষ্ট নেই। আমার মতো পাগল ছাগলের আর ভালো জায়গা কোথায় হবে। সাবলীলভাবে কথাগুলো বলে দিল। সবসময় একটা ব্যস্ততা একটা অস্থিরতা দেখি কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেনা। কথাগুলো জড়ানো, তবু বুঝতে পারলাম তিনি যেখানে থাকেন ওই জায়গাটা আমার চেনা। সামনে এক মন্দির আছে রাতে ওখানেই থাকে। ঝড় জল বৃষ্টি গায়ে লাগেনা। খেতে পায় কিনা জিজ্ঞেস করতেই আবার বড় বড় পা ফেলে চলে গেল।



অনেক রকমের পাগল আছে । সবার কী আর আচরণে ধরা পড়ে, কত মানুষ তাদের অস্বস্তিগুলোকে লুকিয়ে রেখে দেয় কষ্ট পায়।কেউ সুস্থ হয়ে যায় উপযোগী পরিবেশ পেলে।কেউ আস্তে আস্তে তলিয়ে যায়।ওকে নিয়ে আমার বিস্ময়ের শেষ নেই।





আবার একদিন দেখা হয়ে গেল। চা আর সিঙ্গারা খাবে বলে টাকা চেয়ে চলে যাচ্ছিল আমার চেনা এক ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন পাশ দিয়ে। আমাকে ওখানে দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছেন। ওকে দেখে ভদ্রলোক বললেন আজকাল পুজো টুজো করছ নাকি ভাই, বুঝলাম ব্যঙ্গ করছেন। বাদল আমাকে দেখিয়ে ওঁকে বলল এই দিদিদের বাড়ি কত পুজো করেছি কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলামনা। এটা শুনেই ভদ্রলোক অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। বাদলের কথা বলার ভঙ্গি দেখে মনে হলনা ও পাগল।ভদ্রলোক ভুল কিছু বলেননি বাদল আগে পুজোটুজো করত, সেই সূত্রেই আমাকেও চেনে।আমিও সামান্য চিনি।




এরপর বহুদিন তাকে দেখা গেলনা। সারাদিন রাস্তায় আঁকতো। চক বা রং না, ভাঙা ইঁটের টুকরো দিয়ে নানারকম ছবি আঁকতো দেখতাম। সবাই জানত ব্যাপারটা। কেউ ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা কোনদিন ভাবেনি। অনেকবার বাড়িতে আসতে বলেছি আসেনি। ভেবেছিলাম পুরনো জামাকাপড় মশারি জুতো এগুলো দিয়ে দেব কিন্তু আসেনি।ঠিকানা বলেছি ভুলে গেছে।টাকা দিলেও ফেলে দেয়।


সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছিল আমি বাড়ি ফিরছিলাম। রাস্তায় কোনো রিকশা ছিলনা অগত্যা একাই ফিরতে হচ্ছিল। শুকনো দিনে এতটা ভয় ভয় করেনা। বৃষ্টি হলে চারিদিকটা আরো নিঝুম হয়ে যায়। আমি হেঁটে আসছি দেখি অন্ধকারে কে আমার সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বেশ লম্বা লোকটাকে দেখে একটু ভয় লাগছিল। তারপর পরিচিত কণ্ঠস্বরটা পেলাম। বুঝলাম বাদল আসছে। কেন জানিনা ভয়টা বেড়ে গেল আরো। ভাগ্যিস অন্ধকারে আমাকে দেখতে পায়নি। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে হেঁটে আসবার চেষ্টা করছি। চারিদিকের কোয়াটারগুলোর দরজা জানলা বন্ধ করে রেখেছে। এমনিতেই সন্ধে হলেই সবাই বাইরে বেরোয় না। শব্দ না ওঠে সেভাবেই খুব আস্তে আস্তে আসছি। ঝিঁঝি পোকাদের ডাক, গা ছমছম করা পরিবেশ। বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি তখন স্ট্রীট আলো জ্বলে উঠল। এতক্ষণ অন্ধকারেই ছিলাম। বাদল পুরো রাস্তা সামনে সামনে এল।কোয়াটারের কাছে আসতেই ও পেছনে তাকাল বেশ জোরে জোরে বলল

 -যান দিদি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে যান, বৃষ্টিটা বেড়েছে। ওকে বললাম আসুন বাড়িতে, আপনি তো আগেও এসেছেন।ও কোনো উত্তর দিলনা।বড় বড় পা ফেলে প্রচন্ড বৃষ্টিতে আবার কোথায় চলে গেল বুঝতেই পারলাম না। ও তো আসলে পদাতিক।পথেই জীবন কাটায়।রক্ষা করে।




দীপালোক ভট্টাচার্য।। পারক গল্পপত্র


                     


।।এক।।

সেই একই চশমাওয়ালা গান্ধীজী। মাঝে বড় বড় করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া লেখা। মাঝ বরাবর ওপর থেকে নিচে চলে যাওয়া চকমকে রাঙতাটাই যা গোলমেলে। তা এতসব কারিকুরি কি দ্রুপদের পক্ষে বোঝা সম্ভব? সেই বেচারা কোত্থেকে এই পাঁচশো টাকার নোটখানা পেয়েছে সেটাই মনে করতে পারছে না।  এটিএম এর পেট থেকে বেরোনো দু হাজার টাকার নোট খুচরো করতে গিয়ে পাওয়া একখানা  পাঁচশো? নাকি টিউশন বাড়িতে দেওয়া নিরীহ খামের মাঝে লুকিয়ে থাকা কড়কড়ে দুটো পাঁচশোর একখানা? কপালে চিন্তার ভাঁজ ধ্রুপদের। 

ঘড়ির কাঁটা রাত বারো ছুঁতে মিনিট খানেক বাকি। একটু পরেই একখানা মিসড কল আসবে, যার অর্থ হলো মোবাইল ইন্টারনেট চালু কর।  তার কয়েক সেকেন্ড পর টুং করে একখানা শব্দ হবে, তারপর ক্রমাগত সেই শব্দকে নিঃশব্দ কম্পনে রূপান্তরিত করতে মোবাইলের সাইলেন্ট মোডে একটা আলতো স্পর্শ।  তারপর পর্দার ঔজ্জল্য যতটা সম্ভব কমিয়ে বুড়ো আঙ্গুলের আলতো ছোঁয়ায় মৌলির সাথে কিছু শব্দ বিনিময়।  প্রতিটা দিনকে আগের দিনের ফটোকপি মনে হতে হতেও হয়না এই স্বল্প সময়টুকুর জন্য।  এই সময়টুকুর প্রতীক্ষায় প্রবল বিরক্তি নিয়েও মুখস্থ করা যায় সংবিধানের কততম সংশোধনীর মাধ্যমে গ্রামসভা গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, কিংবা মগধের রাজধানী কোথায় ছিল বা ২০০৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে কে পেয়েছিলেন এসব নানান হাবিজাবি সাধারণ জ্ঞান। এসব জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে এই বাজারে একখানা সাধারণ চাকরি জোটানো, যাকে ধ্রুপদের ভাষায় পেছন হলুদ।


অন্যদিন এই সময়ে অনেককিছু মুখস্ত করে ফেলে ধ্রুপদ। বারোটার মিসড কলটাকে টার্গেট ধরে ফটাফট মুখস্ত করে ফেলে কোচিং সেন্টার থেকে দেওয়া সাধারণ জ্ঞানের তথ্যসমন্বিত কাগজের পাতাগুলি।  একটা চাকরি পেতেই হবে ধ্রুপদকে। যে করেই হোক। আজ ঘুরে ফিরে পাঁচশো টাকাটার কথাই মনে হচ্ছে। বিকেলে কোচিং সেন্টারে পড়া শেষে প্রতি মাসের কোর্স ফি-র কিস্তি জমা দিতে গিয়ে কাউন্টারের মেয়েটি জানায়, কিছু মনে করবে না, এই পাঁচশো টাকার নোটটা একটু চেঞ্জ করে দাও। না ছেড়া নয়। তাহলে? মেয়েটি ইনিয়ে-বিনিয়ে জানায় টাকাটা জাল। ফি-র টাকাটা দিতে পারেনি আজ। পার্স হাতড়ে বুঝল সাড়ে তিনশো মত আছে। লজ্জার মাথা খেয়ে জাল নোটটা নিয়ে বেরিয়ে আসে কোচিং সেন্টার থেকে।  কোর্স ফি-র টাকা প্রায় পুরোটাই দেয় বাবা। দুদিন আগে দেড় হাজার দিয়েছে। তার ওপর বাড়ির কাজে হাত দিয়েছে। নভেম্বরে দাদার বিয়ে। ঘর দরকার। তাছাড়া রান্নাঘর, বসার ঘরের দেওয়ালে নোনা ধরে যাচ্ছেতাই অবস্থা। প্রতিদিন মিস্ত্রী লেবারের হাজিরা, ইট- সিমেন্টের বিশাল খরচা সামলে সরকারি চাকরি থেকে সদ্য অবসর নিউ বাবা আর কত টানবে? ইংরেজি অ্যাপ্রোপ্রিয়েট প্রিপোজিশন মুখস্ত করতে গিয়ে এসব এলোমেলো ভাবনা আক্রান্ত করল মনসংযোগ।


বারোটা বাজতে দুই। এই এল বলে মিসড কল। হঠাৎ মনে হল ভ্যালিডিটি আজই শেষ। তাহলে? পাপলুকে বললে কেমন হয়? ও বলছিল, ও নাকি বাড়িতে বসেই মোবাইলে রিচার্জ করে। করবে নাকি ফোন?


।।দুই।।

 - তোমার বাবা রায় বানান কি লিখে গো? আর এ না আর ও?

 -শুনতে পারছি না, জোরে বলো। 

 -বললাম, তোমার বাপ কি লেখে আর এ না আর ও?

 -কী লেখে মানে?

 -বলছি যে.... হ্যালো, হ্যালো....

 লাইনটা কেটে গেল। ধ্রুপদ এসেছে পাড়ার সাইবার ক্যাফেতে। রেলের স্টেশন মাস্টার পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি বেড়িয়েছে। সেটার অনলাইন ফর্ম ফিল আপের জন্য। প্রতিবার যেমন হয়, মৌলি বলে, তুমি যখন করছই আমার ফর্মটাও ফিল আপ করে দাও। অনলাইনের অত ঝামেলা আমার পোষাবে না। মাস কয়েক আগে কোন একটা চাকরির পরীক্ষায় মৌলির বাবার নামটা ভুল এন্ট্রি করেছিল ধ্রুপদ।  না,  ঠিক ভুল নয়। মৌলি নিজে রায় বানান আর ও ওয়াই লেখে। এদিকে ওর মাধ্যমিকের অ্যাডমিটে ওর বাবার পদবী ভুলবশত আর এ ওয়াই ছাপানো ছিল।  তারপর থেকে এটাই চলছে। মৌলি আর ও, আর ওর বাবা আর এ।  সেই চাকরির পরীক্ষার এডমিট আসার পর মৌলির টেনশন দেখে মনে হয়েছিল, বাবার পদবীটার ছোট্ট গোলমালের জন্য ওর হওয়া চাকরি আর হলো না। এবার আর কোনো ঝুঁকি নেয়নি ধ্রুপদ। ক্যাফেতে বসেই ফোন করেছে মৌলিকে। কিন্তু ফোনটা কেটে গেল হঠাৎ করবে করবে করেও করল না ধ্রুপদ। করলেও পাবে কিনা কে জানে।  ট্রেনে আছে এখন। আছে বলতে একটু আগেই উঠেছে ওর মায়ের সাথে মামাবাড়ি যাচ্ছে বহরমপুর। মামাতো দিদির ছেলের মুখেভাত। আসতে আসতে আরও তিনদিনের ধাক্কা।

- প্রিন্ট দিয়ে দেবো? ক্যাফের ছেলেটা বলল।

-দাঁড়াও, আরেকবার দেখে নি। কম্পিউটারের পর্দায় অন্বেষী চোখ ধ্রুপদের।

প্রিন্টারের ক্যাঁচকোঁচ শব্দটা বেশ ভালো লাগে ধ্রুপদের।  পর্দায় দেখা দ্বিমাত্রিক হরফ, ছবি সব কেমন ছাপা হয়ে বেরিয়ে আসে আঙুলের ইশারায়।

প্রিন্ট আউটটা হাতে নিয়ে এক ঝলক তাকালো ও। ব্যাংকে জমা দিতে হবে দু'জনেরটা। কালকেই লাস্ট ডেট। মৌলির আসতে আসতে আরো দু'দিন। আর ও থাকলেও কি বলা যেত, তোমারটা তুমি দাও, আমারটা আমি? টাকার অংকটার দিকে চোখ গেল ধ্রুপদের। ওরটা সাড়ে তিনশো। আর মৌলির দুশো কুড়ি। মোট পাঁচশো সত্তর। ওরা এস সি, তাই কম। এটা একটা সুবিধে। না হলে সাড়ে তিনশ করে দু'জনেরটা মিলিয়ে সাতশো টাকা দিতে হতো। মৌলির কাছ থেকে তো নেওয়া যায়না এসব। যায়?


 একটু যদি পড়তো মৌলিটা। ধ্রুপদ ভাবে। ব্যাংক ক্লারিক্যাল এ ওদের কোটায় প্রচুর সিট ছিল। আসলে অংকটায় কাঁচা। কোচিং সেন্টারের মক টেস্টেও মৌলি অংকে মার খায়। জি কে, জি আই, ইংরেজি এসবে ভালোই করে। শুধু অংকটা। নিজের বদলে মৌলির চাকরির কথা কি বেশি ভাবছে আজকাল ধ্রুপদ? ও কি অনেকের মত ভেবে নিয়েছে, পদবীতে চ্যাটার্জি আছে বলে সেই প্রথাগত ভাবনা- জেনারেল কাস্ট? যাস্ট হবে না। কিন্তু একটা দুর্ভাবনাও আছে। মৌলির চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বুমেরাং হয়ে ঘুরে আসবে নাতো বাড়িতে? বাবা-মা এখনো সেভাবে কিছু জানেনা। দাদা কিছুটা জানে। কিন্তু দাদাটাই তো মায়ের পছন্দ করা বামুন ঘরের মেয়ে বিয়ে করে চাপে ফেলে দিল। পরে যদি একটা তুলনামূলক আলোচনা ওঠে? অবশ্য এক্ষেত্রে 'যদি'টাকে ডিলিট করে ফেলাই যায়, তাই না?

ধুর! কি সব আবোল তাবোল ভাবছে ধ্রুপদ? এখন সেভাবে কিছুই হলো না, এখনি এসব ভাবনা। দাদার পাকা কথা হয়ে গেল দিন কয়েক আগে। সেটার আফটারশক হতে পারে।

 হঠাৎ সেই পাঁচশো টাকাটার কথা মনে পড়ল ধ্রুপদের। এই মুহূর্তে ব্যাংকে পাঁচশো কুড়ি টাকা লাগত। পাঁচশো টাকাটা থাকলে....


।।তিন।।

দুপুরে খাওয়ার পর বারান্দায় বসে মোবাইল খুটখুট করছে ধ্রুপদ। নিজের ঘর থেকে প্রায় বিতাড়িত হয়েছে দিন কয়েকের জন্য। ওর ঘরের দেওয়াল জুড়ে নোনা ধরেছে বেশ কয়েক বছর হল। সেই কোন যুগে বানানোর পর আর মেরামত হয়নি। তার ওপর বৃষ্টিবহুল তড়াইয়ের একতলা টিনের বাড়ি। আর ধ্রুপদের ঘরটা তো রোদের জন্য হাহাকার করে থাকে। শেষ বিকেলে এক ফালি রোদ রাঙিয়ে দেয় পুব দিকের দেয়ালটাকে। কিন্তু সে রোদে উষ্ণতা থাকেনা। অবশ্য বিকেলবেলা ঘরে বসে নিস্তেল রোদ্দুর দেখার মতো বিলাসিতা করার সময় কোথায় ধ্রুপদের? হয় ছাত্র পড়াতে ছুটতে হয়, নয়তো চাকরির পরীক্ষার কোচিং সেন্টার।

ওর ঘরের জিনিসপত্র চৌকির ওপর ঢিপ করে রাখা হয়েছে। চৌকিটা ঘরের মাঝখানে। চারিদিকের দেওয়ালে পুরোনো প্লাস্টার চটিয়ে মশলার নতুন প্রলেপ।  মেঝেটাও সম্ভবত চটিয়ে টাইলস বসানো হবে। তবে সেটা হবে কিনা তা নির্ভর করছে বাবার ব্যাংক একাউন্টে কত আছে সেটার ওপর। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর যেমনটা হয় আর কি। ঘরটা একটু সারানো দরকার। তার ওপর বড় ছেলের বিয়ে। নতুন একটা ঘর দরকার। ছোট ছেলের ঘরটাও একটু হাত দিতে হবে। বারবার তো হয়না এসব কাজ। মার একটা বড়সড় রান্নাঘরের শখ।  বাথরুমটাও পুরনো আমলের। মায়ের আর্থারাইটি... বসতে কষ্ট। একটা কমোড হলে মন্দ হয় না। এসব করতে গিয়ে সাত লাখের বাজেট গিয়ে কখন দশ লাখে দাঁড়িয়েছে বাবার নজর এড়িয়ে।


 বারান্দার সামনের ফাঁকা যায়গাটায় ইট বিছিয়ে বালি সিমেন্ট মাখা হচ্ছে। একজন সামনে ঢিপি করে রাখা বালির স্তুপ থেকে টিনে করে বালি আনছে। আরেকজন নির্দিষ্ট অনুপাতে সিমেন্ট আর জল মিশিয়ে কোদাল দিয়ে সুনিপুণভাবে মাখছে যেটাকে ওরা মশলা বলে ডাকে। সেই মশলা আরেক জন শ্রমিক কড়াইয়ে করে নিয়ে যাচ্ছে ধ্রুপদের ঘরে। সেখানে মিস্ত্রি কাজ করছে। রান্না ঘরের পাশ দিয়ে শুরু প্যাসেজটা দিয়ে ওরা যাতায়াত করায় গোটা বাড়ি আর বাড়ি নেই। বালি, জল- কাদা, সিমেন্টে মেঝে মাখামাখি। ধ্রুপদের মায়ের কপাল আজকাল প্রবল বিরক্তিতে সবসময় কোঁচকানো থাকে। কাজ হয়ে যাবার পর প্রতিদিন বালতি- ঝাঁটা নিয়ে আসরে নেমে পড়ে ওর মা। বারন করলেও  শোনে না।

মোবাইল থেকে চোখ তুলে শ্রমিকদের কাজ দেখছে ধ্রুপদ। বাবা পেনশনার্স সমিতির মিটিংয়ে গেছে। ধ্রুপদ কে বলে গেছে একটু নজর রাখতে। আসলে সারা জীবনের সঞ্চয় ভেঙে প্রতিদিন অনেক টাকা চলে যাচ্ছে মিস্ত্রি, শ্রমিকদের মাইনে দিতে। মিস্ত্রি সাড়ে চারশো টাকা আর শ্রমিকদের সাড়ে তিনশো । তিনজন শ্রমিক আর একজন মিস্ত্রি প্রতিদিন কাজ করছে। প্রতিদিন বলাটা ভুল। আজ এটা কাল ওটা বলে কামাই তো আছেই।

 ধ্রুপদ মনে মনে হিসেব করে। শ্রমিকদের হাজিরা ধরলেও প্রতিদিন সাড়ে তিনশো মানে মাসে তিরিশ দিনে সাড়ে দশ হাজার। এদিকে ওর সাতাশ বছর বয়সে বাড়ি বাড়ি ছাত্র পড়িয়ে মাসে মেরেকেটে হাজার চারেক। অজান্তেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো ধ্রুপদের কলজে থেকে।

 -দাদা জলের বোতলটা খানেক দেন তো। জিয়ারুল নামের ছেলেটা ধ্রুপদ কে বলল। পুরনো কোল্ড্রিংসের বোতলে জল রাখা আছে ওদের জন্য। পৌরসভার টাইম কল থেকে মা ভরে রাখে। কুদ্দুস মিস্ত্রিও হাজির জল ব্রেক নিতে। দু লিটারের বোতল নিমেষে খালি।

 - তোমার বাবা আসবে নাকি আমরা চলি যাওয়ার আগে? কুদ্দুস জিজ্ঞাসা করে।

 - কেন বাবা না বলে গেছে তোমাদেরকে দু'দিন পরে দেবে হাজিরা। ধ্রুপদ উত্তর দেয...

 - আরে হাজিরার কথা বলতেছি না দাদা। ওইটা নিয়া কথা হইচে।  কথা হইলো, কাইল তো আমার দুইজন লেবার আসবেনা। যদি পাই বদলি হিসাবে দুইজনকে, তাইলে কাল আসবো নইলে কিন্তু কাল আসতেছি না।

 - বাবা থাকতে বললে না কেন? আমি জানিনা। এমনি কিন্তু তোমরা অনেক দেরি করে ফেলেছ। ধ্রুপদের কন্ঠে ঝাঁঝ। কেন, আসবে না কেন? দু'দিন পর থেকে আসুক তাহলে।

 - আরে ওদেরকে পাইতেছেন কোথায় আপনি? কুদ্দুস বোঝানোর চেষ্টা করে ধ্রুপদকে। ওরা সাউথে যাইতেছ... এইখানে আর কাজ করবে না। আমরাও কোনদিন পালন দিব। কি কস জিয়া?

 -ঠিকে কইচেন দাদা। জিয়ারুল ওর গুটকা শোভিত দাঁত বের করে হাসতে হাসতে জবাব দেয়। পাইসাটাই হইল আসল, তাই না? এইটে হামরা কত করি পাই? সাড়ে তিনশো। তাওতো হেডমিস্ত্রি কুড়ি টাকা কাটি নিবে। আর ওইটে ফালাট-ফালাইওভারের কাজোত মাস মাইনা দিয়া কন্ট্রাকটেরর ঘর লেবার রাখিবে। মাসোত  পঁচিশ হাজার। থাকাটাও ফিরি। পাঁচ হাজার খাইলেও মাসোত ফ্যালে চ্যারে বিশ হাজার জমাও। এক বছর কামাই করিলে দুই লাখ চল্লিশ। ক্যানে যাইম না কন তো এইবার?

ধ্রুপদ উত্তরে কি বলবে ভেবে পেল না। সত্যিই তো। দৈনিক সাড়ে তিনশো  টাকার দিনমজুরিকে লাথি মেরে পঁচিশ হাজারি চাকরির জন্য দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট কাটার মধ্যে একটা গতিময়তা আছে। উদ্দীপনায় ঝলসে ওঠা জিয়ারুলের চোখজোড়া কি ব্যঙ্গ করছে আলমারিতে ল্যামিনেশন করে রাখা ধ্রুপদের মার্কশীট সার্টিফিকেটগুলো কে?

ঘরে চলে আসে ধ্রুপদ। ঘড়িতে চারটে। সাড়ে চারটের সময় নতুন টিউশন বাড়িতে যাবার কথা। কিন্তু ইচ্ছে করছে না।


।।চার।।

 একশো টাকার নোটটা বের করতে গিয়েও করলনা ধ্রুপদ। মনে পড়ল, পার্সে ওই পাঁচশো টাকাটা ছাড়া খুব একটা বেশি নেই। বাবার কাইনেটিক হোন্ডাটা নিয়ে বেরোনোর সময়ই বাবা বলছিলো, মনে হয় তেল খুব একটা বেশি নেই। পারলে একটু ভোরে নিস তো। কাল আবার ব্যাংকে যেতে হবে। এই অবস্থায় দাওতো একশোটা টাকা বলাটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। বিশেষত ধ্রুপদের মত ছেলের পক্ষে।

আজ অনেকদিন পর ঠেকে যাচ্ছে।  রোববার বিকেল টা ফাঁকাই রেখেছে ও। পড়ানো নেই। কোচিং সেন্টারও বন্ধ। মাঝেমধ্যে মৌলির সঙ্গে একটু এদিক ওদিক যে হয় না রোববারের বিকেলে, তা নয়। মৌলি কাল রওনা দেবে বহরমপুর থেকে। আগে থেকেই ভাবা ছিল ছোট পুলের ঠেকটায় অনেকদিন যাওয়া হয়না। পুরোনো বন্ধুরা সবাই যে যার মতো ব্যস্ত নিজের কাজ নিয়ে। রোববার টা পাওয়া যায় সবাইকে এই সময়।

- কি ব্যাপার গুরু, দেখাই নাই আজকাল। কই থাকিস? রঞ্জন যাকে বন্ধুরা আদর করে ফুটো বলে ডাকে। ধ্রুপদ গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করার সাথে সাথে বলে উঠলো ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে।

 ধ্রুপদ কোন উত্তর দেয় না। অর্থপূর্ণ ভঙ্গিতে হাসে। সে হাসির অনেক রকম মনে হতে পারে। চোখ বুলিয়ে দেখল আসর জমজমাট। রনি, পতু, গামছা, সবাই আছে। পোতু নতুন বাইক কিনেছে। ওয়ান এইট্টি পালসার।  সেটাকে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে।

- ব্রেকিং নিউজ এইমাত্র খবর পাওয়া গেল পতু তার নতুন বাইক কেনা উপলক্ষে ছোট পুলের ঠেকের সদস্যবৃন্দকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে পকেটে  কড়কড়ে নোট নিয়ে এসেছে। রাজ রেস্টুরেন্টের দিকে এক্ষুনি তার কনভয় রওনা দেবে। আসুন একঝলক শুনে নেই পতুর প্রতিক্রিয়া। রনি ওর হাতের কাল্পনিক মাইকটা পতুর দিকে এগিয়ে দেয়।

 - বিরোধীদের এই অপপ্রচারে কান দেবেন না বন্ধুগণ। আপনারা হয়তো জানেন না, ব্যাংক থেকে বছরে সাড়ে নয় পার্সেন্ট ইন্টারেস্টে এই বাইক কেনা। ডাউনপেমেন্টের খরচ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার, মানে আমার বাপ। আপনাদের অবগতির জন্য জানাই, খুব শিগগির দিদি জামাইবাবুর চাপে জামাইবাবুর ওষুধের কোম্পানিতে এম.আর হিসাবে জয়েন করতে চলেছি। তাই কেন্দ্রীয় অনুদানে এই বাহন ক্রয়। আপনারাই বলুন, এই আর্থিক সংকটের মধ্যে বন্ধুদের নিয়ে মোচ্ছব করাটা কি উচিত? আমি জনগণের দরবারে প্রশ্ন রাখছি।

 - মাইর খাবি শালা। চাকরি পাইছিস, এতক্ষণ বলিস নাই? তুতানের গলায় উষ্ণতা। চাকরির খাওয়া প্লাস বাইকের খাওয়া। আমরা কিন্তু চিকেন কাটলেটে ভুলতেছি না। বন্ধুগণ, আমি প্রস্তাব রাখছি যে পতু আমাদেরকে ক্যান্ড ভাল্লুক সহযোগে চিকেন ললিপপ খাওয়াবে।

- আমি এই প্রস্তাব সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি। ধ্রুপদ বলল। প্রবল করতালির মধ্য দিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হল সভায়।  পতু কে পেছনে বসিয়ে গামছা পতুর নতুন বাইক স্টার্ট দিল।

 -অই  দাঁড়া, রঞ্জন চিৎকার করে বলল, যে প্রস্তাব সমর্থন করলো, সেই তো শালা নিরামিষ। মালটার জন্য কোলড্রিংস আনিস।

 - না না, লাগবেনা আমার জন্য কোলড্রিংস। ওইটাই খাব। ধ্রুপদের গলা কে ছাপিয়ে গেল একশো আশি সিসি’র সিসির ইঞ্জিন। পতুরা কি শুনতে পেল ওর কথা?

- কিরে, তোর না গন্ধ শুকলেই বমি আসে? আজ কী হইল? তুতান জিজ্ঞেস করল।

-ভাবছি একটা চাকরিতে জয়েন করবো। করবি নাকি? অবশ্য দূরে।

 - কোথায়? কত দিবে রে? কোয়ালিফিকেশন কি? দ্রুপদের ছুড়ে দেওয়া প্রশ্ন সটান লুফে নিল তুতান।

- আরে, সবুর। ধ্রুপদের চোখে দুষ্টুমি। কনস্ট্রাকশন কম্পানি। মাসে পঁচিশ হাজার ইনক্লুডিং লজিং। খাবারটা মেস করে।

- স্টার্টিং হিসাবে মন্দ না, তাই না? তুতান ধ্রুপদের বাবার কাইনেটিক হোন্ডাটার ওপর এসে বসল। আরে  সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোই মাসে আঠারো-বিশ দিতেছে ট্রেনিং পিরিওডে।  জব ডেস্ক্রিপশন কী রে?

 -একদম চাপের না। আট ঘন্টার ডিউটি। তোকে জাস্ট অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি করতে হবে। ধ্রুপদ একটু একটু করে সুতো ছাড়ছে।

 - মানে? তুতানের মুখ হাঁ। বাকিরাও তাকিয়ে আছে ধ্রুপদের দিকে।


- মানে আর কিছুই নয়। ইট, বালি, সিমেন্ট, পাথর এসব মাখা। রাজমিস্ত্রির কাছে কড়াইয়ে করে নিয়ে আসা। মাথায় করে ইট বওয়া। এইত্তো। ব্যাস।  সিমল্পি লেবারি করা যাকে বলে। করবি নাকি বল।  ধ্রুপদের ঠোঁটের কোনে হাসি। সে হাসিতে বিষাদের মিশেল।

 সবাই বিহ্বল হয়ে গেল মুহূর্ত কয়েকের জন্য।  হঠাৎ পিং পিং। ধ্রুপদের মোবাইলে মেসেজ অ্যালার্ট। মনে হয় মৌলি। পকেটে হাত দিতে গিয়েও দিল না ধ্রুপদ।



।।পাঁচ।।

 -দাদা, ও দাদা।

 হেডমিস্ত্রির গলা। ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি টোয়েন্টি দেখছে ধ্রুপদ। বাবা-মা গেছে শিলিগুড়ি।  ছোটমেসো হঠাৎ করে বাথরুমে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। এখানকার নার্সিংহোম থেকে শিলিগুড়ি রেফার করেছে। বাবা-মা ওই অ্যাম্বুলেন্সেই চলে গেছে মাসিদের সাথে। আজ মিস্ত্রির- লেবারদের মাইনে দেওয়ার কথা। তাড়াহুড়োর চোটে বাবা ভুলে গেছিল তখন। একটু আগে ফোন করে বলল, আলমারির লকারে টাকা আছে। সাড়ে চার হাজার টাকা কুদ্দুসকে দিয়ে দিস। ধ্রুপদ বারান্দায় এসে দেখে সবাই কাজ গুটিয়ে বাড়ি যাবার জন্য তৈরি।


 - কাকু দিয়া গেছে না টাকা?  কুদ্দুস মিস্ত্রি জিজ্ঞাসা করল।

 - হ্যাঁ। দাঁড়াও এক মিনিট। ধ্রুপদ ঘরে আসে টাকা নেওয়ার জন্য। আলমারির লকার খুলে দেখে ওপরেই একটা খাম রাখা। ওপরে লেখা লেবার পেমেন্ট। গুনে গুনে ন’খানা পাঁচশো টাকার নোট বের করল খাম থেকে। বারান্দায় এসে আবার টাকাটা গুনল ধ্রুপদ।


 - বাবা সাড়ে চার হাজারের কথা বলে গেছে। কুদ্দুস মিস্ত্রির দিকে তাকিয়ে বলল ধ্রুপদ।

 - আরেকটু বেশি হইলে ভালো হইতো। ঠিক আছে। থাউক গিয়া। কাকুর সাথে কথা বইলে নিব এখন পরে। কুদ্দুস এগিয়ে আসে।

 - এক মিনিট দাঁড়াও। ধ্রুপদের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। এক ছুটে ঘরে এসে ওর মানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকার নোট টা বের করে খাম থেকে বের করা নোটগুলোর একটা নিজের মানিব্যাগে ঢোকায় কাঁপা কাঁপা হাতে। আবার গোনে।  সেই পাঁচশো টাকার নোটটা মাঝে দিয়ে দেয়। গোনার সময় ভাল করে খেয়াল করে কিছু বোঝা যাচ্ছে কি না। না। ধ্রুপদের হাত কোন ফারাক খুঁজে পায় না আসল নকলের।


 - এই নাও। 

নোটগুলো হাতবদল হয়ে চলে আসে কুদ্দুস মিস্ত্রীর কাছে। সে লেবারদের হাতে টাকা দেয়। বাকীটা পকেটে ঢোকায়।

 - কী হল গুনে দেখলে না? ভেতর ভেতর অস্থির লাগছে ধ্রুপদের।

- তোমরা ল্যাখাপড়া জানা মানুষ, কুদ্দুস ওর থলে ব্যাগে সরঞ্জাম ভরতে ভরতে বলে, আর আমরা অনেক মানুষ চড়াইচি তো। মানুষ চিনি। কে কেমন। চুকলিবাজি সবাই করতে পারে না।

 কুদ্দুস সাইকেলের প্যাডেলে পা দেয়। পাশের বাড়ি থেকে শাঁখ বেজে ওঠে।  ধ্রুপদ ঘরে আসে। টিভিতে বিরাট কোহলি রান আউট হল। আর বোধহয় পারবে না ভারত। এক ওভার চার বলে উনচল্লিশ রান লাগে জিততে। হঠাৎ বিছানার তোষক তুলে টিভির আলোতেই দেখে ব্যাংকের চালানটা ঠিকমতো রাখা আছে কিনা। কালই ব্যাংকে যেতে হবে। কালকেই লাস্ট ডেট।

 মশা পনপন করছে। কিন্তু আলো জ্বালতে ইচ্ছে করছে না। কুদ্দুস মিস্ত্রি নাই চিনুক, নিজেকে নিজের কাছে খুব অচেনা মনে হল ধ্রুপদের।


গোপা মুখোপাধ্যায়।। পারক গল্পপত্র



ঘড়ির কাঁটা ঠিক আটটা আর বারোটার ঘরে অনিতা বাবাকে খাইয়ে, ঘুমের ওষুধটা ও খাইয়ে ছিল। ওর হাতে আজ আর বেশী সময় নেই, আজ রাতেই বাবার, ঘুম ধরলে ওকে কাজটা শেষ করতে হবে। তাই আর একমুহুর্ত্ত ও দেরী করতে চাইছে না।   বাবাকে কিছু বুঝতে দেয়নি অনিতা। রোজকার মতো বাবাকে ঔষুধ খাইয়ে গায়ে মাথায় হাতও বুলিয়ে দিলো। বাবার বিছানার পাশের টেবিলে জল, ওষুধ, আর যে লাঠিটাতে ভর দিয়ে বাবা দু এক পা হাঁটেন, সেই লাঠিটা ও বিছানার কাছেই রেখে দিল। কারখানার এক্সিডেন্টে একটা পা বাদ চলে গেছে। আর একটা পায়ে তেমন জোর নেই। সেদিনের কথা আজও মনে পড়ে। বাবা কারখানায় সুস্থ অবস্থায় গেলেন, কিন্তু ফিরেছিলেন পঙ্গু হয়ে, হাসপাতালে দেড় মাস থাকার পর। কিন্তু আশা ছাড়ে নি অনিতা। অনেক চেষ্টা করেছিল। শেষরক্ষা করতে পারে নি। বাবা অখিলেশ বাবু বিছানা গ্রস্ত হয়ে গেলেন। বাবার এ অবস্থায় সংসারটা প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল। বাবা, মা, দুই বোন, সকলেই বড়ো।  তাই সংসার খরচা ও বেশী ছিল।    চারদিকে যখন ইন্টারভিউ দিতে দিতে অনিতা ক্লান্ত, ঠিক তখনই একদিন অধীরদার সাথে ওর দেখা। অধীরদাই ওকে এই কোম্পানীতে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ও ঋণী অধীরদার কাছে। মায়ের মুখে হাসি ফুটেছিল সেদিন। কিন্তু  কারো  কালো দৃষ্টি ওদের সংসারেকে শান্তি দিলো না। ওর বোন অমৃতার নিত্য নতুন সাজগোজ ওদের বাড়ীতে একটা খারাপ আশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। পরে মা, বাবা, দিদি  কাউকে কিছু না জানিয়েই, একটা অপরিচিত মানুষের সাথে চলে গেল অমৃতা।  ওর মায়ের হার্ট এতো বড়ো আঘাত সহ্য করতে পারলো না। হার্ট অ্যাটাক হয়ে অকালে দিব্যি চলে গেলেন মা। এখন শুধু বাবা মেয়ের সংসার।      

রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ও যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ওর মাকে, দুচোখ জলে ভরে ওঠে। মোবাইল হাতে নিয়ে একবার হোয়াটস্ অ্যাপটা খোলে। না, অর্জুন ওর পাঠানো  দশটা ম্যাসেজই সিন করেছে। কোন উত্তর দেয়নি। এবার ওর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায়। বুকের চাপা কষ্টটা কান্না হয়ে আর বেরিয়ে আসে না । দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে শুনতে পায় পিছন থেকে ওর ছেলেবেলার বান্ধবী সুমনার গলা। ‘সরোজীনি বিদ্যাপীঠ’ থেকে ক্লাস টেনের সব মেয়েদের দল বেরিয়ে আসছে। অনিতা আর সুমনা গল্প করতে করতে পাশাপাশি হাঁটছে। হঠাৎ পিছন থেকে সুপর্নার গলা। ওকে ডাকছে।

 “অনিতা, এই অনিতা”। 

অনিতা ওর দিকে তাকাইতে দেখে সুপর্না একজন কে হাত ধরে টানতে টানতে ওর দিকে নিয়ে আসছে। সুন্দর মিষ্টি চেহারা, লম্বা, মুখে হালকা দাড়ি গোঁফের রেখা। সুপর্না হেসে বলে, “আমার পিসতুতো দাদা, অর্জুন।”  

আনিতা বলে, “হাই, আমি অনিতা।”

সুপর্না দুষ্টু হেসে বলে তোকে খুব পছন্দ। রোজ দুর থেকে দেখে।”  

অনিতা এবার লজ্জা পায়। সেদিনের সেই আলাপ। ধীরে ধীরে ভালোবাসায় পরিনত হয়। কেটে  যায় আরো তিনটে বছর। অনিতা কলেজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অর্জুনের সাথে দেখা করে। কখনো নদীর ধারে কখনো ও বা নির্জন বটগাছের শীতল ছায়ায় বসে গল্প করেও শেষ হয় না ওদের  দুজনের কথা । রোজ কতো কথা বলে ওরা। স্বপ্ন দেখে দুজনেই। কখনোও বা অর্জুন ওর চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে কবিতা আওড়ায় , “ চুল তার কবেকার ............।” 

অনিতা বলে , “আ! কি করছ কি?”

অর্জুন বলে “কি আবার! এসবইতো আমার।” 

অনিতা হারিয়ে যায় অর্জুনের চোখের তারায়।   

কখনো বা অজান্তে দুজনের ঠোঁট এক হয়ে যায়, সুপর্না সব জানে। অনিতাকে ‘বৌদি’ বলে ডাকে ।

মাঝে মাঝে দুষ্টমি করে  বলে, “কবে আসছিস বলতো বৌ হয়ে?”   

“অনিতা বলে আগে তোর দাদা একটা চাকরি জোগাড় করুক।”  সুখের সময় বড়ো ক্ষনস্থায়ী।  নির্জন ঘরে অনেকবার অর্জুন আর অনিতা একসাথে অনেকসময় কাটিয়েছে। অনিতা সেদিন অর্জুনের ভাড়া ঘরে এসে নিজের হাতে ওকে রান্না করে খাওয়ালো। সারাদিনই ওরা একসাথে ছিল। মনে হচ্ছিল যেন নবদম্পত্তির সংসার। দুপুরে দুজনে একসাথে খেতে বসে ছিল মেঝেতে। একসাথে খাওয়াতে যে কি আনন্দ! অনিতা খুশিতে পাগল সেদিন। তারপর একবিছানায় দুই নরনারী। ভালোবাসার আনন্দে জড়িয়ে দুজনে শুয়ে পড়ে। আকাশে কালবৈশাখীর কালো মেঘ। নিমেষে ঝোড়ো হাওয়ায় ঝরিয়ে দেয় অকাল বর্ষনে। সেই প্রাকৃতিক নিয়মে বাঁধা এই দুই নরনারী ও জীবনের কালবৈশাখীর প্রলয় বইয়ে দেয় ছোট্ট বিছানায়। অনিতার অনাবৃত বুকে মুখ গুঁজে অর্জুন সেদিন কী স্বপ্ন দেখেছিল তা অনিতার জানা নেই। কিন্তু অর্জুনের প্রসারিত বুকে মুখ গুঁজে অনিতা এক নতুন পৃথিবীকে খুঁজে পেয়েছিল। কি অনাবিল সুখ  তখন অনিতার মনে।  

বাড়ীতে অনিতা বাবা মাকে অর্জুনের কথা বলে। বাবা মা মেয়ের ভালোবাসাকে আনন্দের সাথে মেনে নেয়। অর্জুনকে নিমন্ত্রন করেন ওর মা। নিজেদের সংসার সম্পর্কে সব জানায় অর্জুনকে। হঠাৎ আসে খুশীর খবর। অর্জুন এস এস সি তে সিলেক্ট  হয়েছে। বান্দোয়ান হাইস্কুলে ওর পোষ্টিং হয়েছে। খুশী আর ধরে না অনিতার মনে।  দুচোখে আগামী দিনের সোনালী স্বপ্ন ওর। অর্জুন আর অনিতা দুজনে দুজনের ভালোবাসাকে গভীর ভাবে উপোভোগ করে সেদিনও। ঠিক তার পরদিনেই অর্জুন রওনা দেয় বান্দোয়নে। চোখের দুরত্বে ধীরে ধীরে মনের দূরত্বও বেড়ে যায়। অর্জুন আগের মতো আর ফোন করে না অনিতাকে। সময়ের অভাবের দোহাই দেয়। অনিতা সাময়িক মেনে নিলেও মন থেকে মানতে পারে না। ওর বাবার এক্সিডেন্টের খবর পেয়ে ও অর্জুন দেখতে আসে না। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ফোনেই সান্ত্বনা দেয়। মনকে শক্ত করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু আন্তরিকতা যেন কোথাও স্পর্শ করে না। তাও ফোন নম্বর আছে বলে হোয়াটস্ আপে মাঝে মাঝে কথা হয়। যদিও অর্জুন খুব কম সময়ই উত্তর দেয়। 

একদিন ডিপিতে অর্জুনের সাথে একটি  সুন্দরী মেয়ের ছবি দেখে অনিতা। অফিসেই সেদিন অজ্ঞান হয়ে যায় ও।  তারপর অধীরদা এসে ওকে বাড়ীতে পৌঁছে দেয়। অনিতা অর্জুনকে জিগ্যেস করে ঐ মহিলার সম্পর্কে।

 অর্জুনের স্পষ্ট জবাব, “আমার বান্ধবী, ঈশিতা।”  

অনিতা বলে, “কোথায় থাকেন?” 

অর্জুন বলে, “বান্দোয়ানে। আমার স্কুলেই চাকরী করেন।”     

বড় শ্বাস নিয়ে অনিতা বলে। “ভালো থেকো।” 

অর্জুন ফোনটা কেটে দেয়। তারপর দীর্ঘ দিন কোনও কথা হয়নি। ঘুম থেকে উঠে বাবা আর মেয়ের সেই একই রুটিন। অনিতা সকালে রান্না সেরে বাবাকে স্নান করানো, খাওয়ানো এমনকি বিছানার কাছে সমস্ত ওষুধ, জল রেখে বাবাকে শুইয়ে দিয়ে তারপর অফিসে যায়। আর বৃদ্ধ অখিলেশ বাবুর সারাদিন শুয়ে শুয়ে কড়ি বর্গা গোনা আর স্মৃতি রোমন্থন করাই কাজ। কোনো ও পরিবর্তন নেই ওদের  জীবনে। অনিতা ফিরে এসে বাবার কাছে বসে একটু কথা বলে। তারপর রান্না ঘরে গিয়ে সমস্ত কাজকর্ম করে। মাঝে মাঝে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের  মাধ্যমে পুরানো বন্ধু বান্ধবীর সাথে একটু আধটু কথাবার্তা হয়। ছোটবেলায় পড়া-গল্পের বইগুলোও সময় পেলে উল্টে পাল্টে দেখে। কিন্তু আজকাল ওর আর কিছুই ভালো লাগে না। 

আজ আকাশটা দুপুর থেকেই কেমন যেন গুমরে গুমরে আছে। তখন থেকেই অনিতার মনে হচ্ছিল জোর ঝড় উঠবে। কিন্তু না, একটু ঝোড়ো বাতাস দিয়ে মেঘটা সারা আকাশে ছড়িয়ে দিল। ওর অফিস থেকে বেরিয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটা পথ তারপর বাস ধরে চল্লিশ মিনিটের পথ। ও ছট্ফট্ করছিল বাড়ীতে বাবা একা আছেন, ঝড় উঠলে দুশ্চিন্তা করবেন এটা ভেবে। বাস থেকে নেমে পাঁচুদার দোকানে বাবার জন্য সুগার-ফ্রি কিনে নিল। এবার বাজার পেরিয়ে অশ্বত্থ তলার মোড়ের বাঁকেই দেখা সুপর্ণার সাথে। অনেক বছর পর সুপর্ণার চেহারায় নতুনত্ব এসেছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে লুধিয়ানার ওর সুখের সংসার। সবই শোনা ছিল অনিতার। আজ স্বচক্ষে দেখতে পের। চিনতে ওর একটুও অসুবিধা হয়নি। সুপর্ণা এগিয়ে এল ওর দিকে। কেমন যেন অপরাধীর মতো তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ অনিতার দিকে। দুজনে কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর নীরবতা ভঙ্গ করে সুপর্না বলে, “অনিতা, কেমন আছিস?”  

অনিতা শুধু ঘাড় নাড়ে । বুঝিয়ে দেয়, “ভালো।” 

সুপর্না বলে, “আমাকে ক্ষমা করিস রে।”   

অনিতা বলে, “তোর কোনো দোষ নেই।” 

সুপর্না বলে , “কাল দাদার বিয়ে, তোকে না বললে আমার আরো ও অপরাধ হবে।”  

অনিতা এতটা শুনবে তা মনে ও ভাবতে পারেনি। 

দুচোখ দিয়ে দরদর করে জলধারা নেমে আসে অনিতার, মনে মনে চরম কষ্ট পেলেও মুখে আলতো হাসি হেসে বলে অনিতা , “ওরা ভালো থাক রে সুপর্না”।  

এক বুক কষ্ট নিয়ে বাড়ী ফিরে আসে অনিতা। মায়ের ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন কেঁদে মনটা হাল্কা করে নেয়। তারপর বাবার কাছে গিয়ে তাঁর সারাদিন শরীর কেমন ছিল সে খোঁজ খবর নেয়। মনে মনে খুব কষ্ট ও পায় এই সৎ মানুষটির জন্য। ভগবানের উপর রাগ ও হয়। বাবা কেমন করে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, “বোস্ একটু আমার কাছে ।” 

অনিতা একটু কঠোর হয় মনে, বলে, “না আগে রান্নাটা করে নিই।”  

বাবা বলেন , “সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেল, এক শুধু তুই-ই পারলি না ।”  

অনিতা বলে, “আজ সুপর্নার সাথে দেখা হল বাবা।”  

উৎসুক হয়ে বাবা বলেন , “তাই! কেমন আছে ওরা ? অর্জুন ? ”

 অনিতা বলে,” খুব ভালো আছে ওরা সবাই।”  

বাবা বলেন , “আমাদের কথা মনে আছে ওর ?”  

মিথ্যা কথা বলতে অভ্যস্ত নয় অনিতা । তাও বাবার কাছে এসে বলে , “খুব মনে আছে। তোমার কথাও জিজ্ঞাসা করেছে”।     

বিছানা গ্রস্ত বৃদ্ধ মানুষটির চোখে মুখে প্রশান্তীর ছায়া দেখতে পায় অনিতা। ক্ষমা চেয়ে নেয় বিধাতার কাছে।  আরে, রাত  একটা বেজে গেছে। কোন্ কল্পনার জগতে ছিল এতক্ষন অনিতা! বুঝতেই পারে নি সময় নিজের গতিতে চলে যাচ্ছে। না না। আর নয়। আর এক মুহুর্তও দেরী না। কত কিছু ওর করার ছিল। হল না। এক একটা দিন যেন ওর কাছে এক একটা যুগ মনে হচ্ছিল। সুখ বা শান্তি কোনটাই ওর কাছে বেশী দিন টেকেনি। বোন মায়ের মতোই দেখতে ছিল আর অনিতা বাবার মতো। মায়ের মুখে পুরোটাই বাঙালী শিক্ষিত গৃহবধূর সৌন্দর্য্য ছিল। সুন্দর করে শাড়ি পরা। গোল গোল হাতে শাঁখা পলা আর এতেই মা যেন সর্বসুন্দরী ছিলেন । কী ব্যক্তিত্বপূর্ন সৌম্য চেহারা ছিল মায়ের। এবার সিলিং ফ্যানটার দিকে একবার তাকালো অনিতা। তারপর নিজের একটা শাড়ী নিয়ে ঠিক করে সিলিং এ ঝুলিয়ে নিল। না , আর একটুও সময় নষ্ট করবে না অনিতা। একবার মায়ের ফটোটার দিকে তাকালো। অস্ফুট স্বরে মাকে বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দাও মা, আমি খুব স্বার্থপর মেয়ে তোমার।” টুলটা বিছানার উপর রেখে নিজের হাতে লেখা  সুইসাইড নোট টা হাতে ভাঁজ করে নিল। এবার শেষ বারের মতো মায়ের ফটোর দিকে তাকালো, টুলটাতে উঠে ঝুলন্ত শাড়ীটাতে গলাটা পরাতে যাবে,  এমন সময় বাবার ঘর থেকে একটা জোর আওয়াজ এল। ঠিক যেন কিছু একটা পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে টুল থেকে নেমে অনিতা ছুটে আসে বাবার ঘরে।

এসে দেখে, বাবা জল খেতে গিয়ে হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে গেছে মাটিতে, জলে সারা বিছানা ভিজে গেছে। না, কোন রাগ নয়। মনে মনে ভাবে এই অসহায়- মানুষটাকে এই স্বার্থপর পৃথিবীতে কার ভরসায় রেখে চলে যাচ্ছিল অনিতা! নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হয়। বাবার মুখে কি অসহায় একটা ছাপ। সেই মানুষটাকে, যে নিজের পেট কেটে পয়সা রেখে ওদের দুই বোনকে মানুষ করেছেন, সমাজে চলতে শিখিয়েছে, তাকেই আজ পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ভেবেও অনিতা একা করে চলে যাচ্ছিল অন্য এক স্বার্থপর মানুষের জন্য। পরম আদরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে অনিতা। বাবার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “আমি তো পাশের ঘরেই আছি বাবা, আমাকে ডাকলে না কেন?”    

বাবা বলেন, “সারাদিন তুই এতো পরিশ্রম করিস তাই তোকে আর ডাকলাম না। ভাবলাম নিজেই জলটা নিয়ে নিতে পারবো। বড়ো তেষ্টা পেয়েছিল রে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। তাই....” 

এবার আর অনিতা থাকতে পারে না। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। অনিতা সামনের পৃথিবীতে মুহুর্তে শুধুই বাবার অসহায় মুখটা। আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। বাবাকে জড়িয়ে বলে , “বাবা গো, আজ থেকে আমি এই ঘরেই তোমার কাছে শোব, তোমাকে একা রেখে কোথাও চলে যাবো না বাবা।” 

 আর মনে মনে ধিক্কার জানায় নিজের অন্ধ ভালোবাসাকে। ঘৃণা হয় নিজের উপর। বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে পরম শান্তি পায় অনিতা, আর অখিলেশ বাবু কিছুই বুঝতে না পেরে ও মেয়ের মাথায় তাঁর আর্শীবাদের হাত রেখে অনিতার পরমায়ু যেন বাড়িয়ে দিলেন। নবজন্ম হলো অনিতার। 

 

অংশু প্রতিম দে।। পারক গল্পপত্র



-“তুই যাবি?” জানতে চাইছে রাজাদা। বাপনের পরেই রাজাদার লাইন। বাপন না গেলে রাজাদা প্যাসেঞ্জার তুলবে।

-“যাবো না কেন?” বাপনের কথাতে ঝাঁজ স্পষ্ট। 

-“তাহলে লোক তোল গাড়ীতে। টেম্পার নেওয়ার কী আছে!” বাপনের একটু খারাপই লাগছিলো। রাজাদাকে এভাবে বলাটা ঠিক হল না। স্ট্যাণ্ডের গুটি কয়েক ভালো মানুষের মধ্যে রাজাদা অন্যতম। 

অফিস টাইমে অটো ভরে উঠতে সময় লাগে না। বাপনের পাশের সীটে একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা বসেছেন। বাপনের বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরোনোর সাথে সাথে মনে পড়ল কয়েক মাস আগের এক সকালের কথা।

-“আরে, কণিষ্ক না!” বাপন অবাক! ডানলপ-নোয়াপাড়া রুটের অটো ড্রাইভার বাপনের যে কণিষ্ক নামটা আছে সেটা ও নিজেও ভুলে গেছিল! অফিস টাইমে প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষায় ডানলপ স্ট্যাণ্ডে বসে থাকা বাপনকে চিনতে পেরে ওই নামে ডেকেছিল ঋতিকা। 

ঋতিকা! কলেজের দিনগুলোয় বহুজনের হার্টথ্রব। ঋতিকাকে প্রপোজ করতে গিয়ে অনেকেই মুখ পুড়িয়েছিল। কেউ কেউ ছিল সাইলেন্ট প্রেমিক। যেমন কণিষ্ক ওরফে বাপন। তবে বাপন যে দুবছর কলেজ করেছিল ঋতিকার সাথে কথাবার্তা হত। বাবার হঠাৎ মৃত্যুর জন্য কলেজ মাঝপথেই ছেড়ে দিয়ে বাপন রুজি-রোজগারের ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কঠোর বাস্তবের জমিতে তখন প্রেম হাওয়া।  

এতদিন বাদে এরকম একটা পরিস্থিতিতে ঋতিকা বাপনকে চিনতে পেরেছে শুধু না, ওর সাথে সেই কলেজের বন্ধুর মতই ব্যবহার করছিল। সেদিন অটোয় যেতে যেতে ঋতিকা জানালো প্রতিদিন ও নোয়াপাড়া থেকে নেতাজীভবন যাতায়াত করে। ভবানীপুরে ঋতিকার অফিস কটায় শুরু, ছুটি কটায় সব জেনে গেল বাপন। ভালো লাগছিল বাপনের। সেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় নোয়াপাড়ায় নেমে ঋতিকা অটো স্ট্যাণ্ডে দেখল কণিষ্ক অটো নিয়ে অপেক্ষা করছে। ঋতিকা উঠতেই আর কোনো প্যাসেঞ্জার না তুলেই ছেড়ে দিয়েছিল অটো।

সেই থেকে প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে বাপন শুধুমাত্র একজন সওয়ারি নিয়েই এক ট্রিপ মারত। সকালে ঋতিকা স্ট্যাণ্ডে না আসা অব্ধি বাপন লাইন ছেড়ে দিত বাকিদের। বাকি অটোচালকদের কাছে চোখে লাগছিল ব্যাপারটা। এই নিয়ে বাপনের পেছনে লাগতেও ছাড়েনি তারা। তবে বাপনের হাবভাব দেখে ধীরে ধীরে বুঝে গেছিল বাপন সীরিয়াস। কিন্তু সীরিয়াস হয়ে কী হল?

কলেজে চঞ্চলের সাথে স্টেডি অ্যাফেয়ার ছিল ঋতিকার। ওদের থেকে এক ব্যাচ সীনিয়ার। কলেজের টপার আর প্রচণ্ড কেরিয়ারিস্টিক ছেলে চঞ্চল। দেখতেও বেশ হ্যাণ্ডসাম। ঋতিকা আর চঞ্চল যেন রাজযোটক। একেবারে মেইড ফর ইচ আদার! কলেজের সবাই জানতো চঞ্চলের সাথেই বাকি জীবনটা কাটাতে চলেছে ঋতিকা। 

কলেজের পাট চুকিয়ে দেশের বাইরে পড়তে চলে গেল চঞ্চল। এদিকে কণিষ্কও পার্ট ওয়ানের পরে কলেজ ছেড়ে দিয়েছে। কলেজ সংক্রান্ত আর কোনো খবর না পেলেও চঞ্চল ঋতিকার লাভস্টোরির দি-এণ্ড হয়ে যাওয়ার খবরটা কণিষ্ক জেনেছিল। শুনেছিল চঞ্চল বাইরেই সেটল্‌ড হয়ে গেছে।  

ঋতিকার জীবনে একজন অটোচালকের যে কোনো জায়গা থাকতে পারে না সেটা বোঝে বাপন। তাও কেন জানে না অফিসের দিনগুলোয় দুবার ঋতিকার ক্ষণিকের সান্নিধ্য পাওয়াই বাপনের কাছে মোক্ষ হয়ে উঠেছিল। ঋতিকাও যে ওর সঙ্গ উপভোগ করত সেটা বাপন ফীল করত। কয়েকদিন শুধু ওকে নিয়ে বাপনের অটো ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ঋতিকা পেছনের সীটে না বসে বাপনের পাশেই বসত। খুশী হলেও ঋতিকার শরীরের স্পর্শ এড়িয়ে বেশ আড়ষ্ঠ হয়েই অটো চালাতো বাপন। ঋতিকা বেশ মজা পেত। বাপনের দিকে একটু সরেই বসত ইচ্ছে করে। ঋতিকার বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে ক্রমে জড়তা কাটছিল বাপনের। 

এক ট্রিপ প্যাসেঞ্জার নোয়াপাড়ায় নামিয়ে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল বাপন। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে আজ। বাড়ী থেকে চা খেয়ে বেরোনোর সময় ছিল না। টুং-টাং শব্দে বাপন বুঝলো ওর স্মার্ট-ফোনে মেসেজ ঢুকছে একে একে। কলেজের বন্ধুদের একটা গ্রুপ আছে। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় মেসেজ চালাচালি। বাপনের এসবের বালাই ছিল না কোনোকালেই। পয়সা জমিয়ে শখ করে স্মার্ট-ফোন কিনেছিল একটা। টুকটাক ফটো তোলা, দুর্গাপুজোর ভাসানের ভিডিও করা, ব্যস ওই অব্ধিই দৌড় ছিল! ঋতিকাই ওর ফোনে ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ চালু করে দিয়েছিল। তারপরে ওর নাম্বারটা কলেজের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে ঋতিকাই জুড়ে নিয়েছিল।  

-“অটো চালানোর কাজকে আমি ছোট বলে মনে করি না। তবে গ্রুপে সবার মানসিকতা তো সমান নয়। সবাইকে অত ডিটেলসে বলার দরকার নেই তুই কী করিস। বিজনেস করিস, ব্যস ওইটুকুই বলবি।” ঋতিকা গ্রুপের বাকি বন্ধুদের জানিয়েছিল যে কণিষ্ক ব্যবসা করে। পরে ওকে এভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল। কণিষ্ক মেনে নিয়েছিল ঋতিকার কথা।  

-“ওয় আশিক! কী এত দেখছিস মন দিয়ে, দেখি।” প্যাসেঞ্জারের চাপ কম থাকে দুপুরের দিকে। অটোয় বসে মোবাইল ঘাঁটছিল বাপন। কলেজের গ্রুপে চুপচাপ থাকলেও মেসেজগুলো পড়ে। গ্রুপে হঠাৎ ধূমকেতুর মত আবির্ভাব ঘটেছে চঞ্চলের। দেশে ফিরে এসে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করেছে, ঋতিকার সাথেও। গ্রুপে ঋতিকাই চঞ্চলকে অ্যাড করেছে। চঞ্চলের সাথে ঋতিকার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে জোর আলোচনা। চঞ্চল আর ঋতিকার পুরোনো কেমিস্ট্রি ফের সক্রিয় হয়ে উঠলেও কণিষ্কর মন মানতে চায় না! ও শুনেছিল কেরিয়ারের সুবিধার জন্য চঞ্চল এক মার্কিন মহিলাকে বিয়ে করেছিল। বর্তমানে চঞ্চল ডিভোর্সি। ঋতিকাকে পেতে চাইছে আগের মত। কিন্তু কণিষ্ক বুঝতে পারছে না ঋতিকা কি করে চঞ্চলকে মেনে নিচ্ছে!  

-“ওহো, দিলরুবার ছবি দেখছিস।” কথাটা বলে বাপনের হাত থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নিল রিচা। ছবিই দেখছিল বাপন। গ্রুপে ছবি দিয়েছে ঋতিকা। চঞ্চলের সাথে কাপ্‌ল ছবি। মাঝেমধ্যেই দিচ্ছে এখন। সেইসব ছবি দেখলে বাপনের বুকের ভেতর থেকে একটা দলা পাকানো কষ্ট ঠেলে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে দিয়ে। 

রিচা কলগার্ল। ডানলপ চত্বর ওর চৌহদ্দি। বরানগর রেল স্টেশনের কাছাকাছি সায়রাবিবির ঠেকে রিচার খুব ডিমাণ্ড। প্রদীপের সাথে বাপন একবার সেখানে গিয়েছিল। অনেক নেশা করে নেশার ঝোঁকেই প্রদীপের সাথ ধরেছিল। প্রদীপ ওইসব জায়গার রেগুলার কাস্টমার। ঝোঁকের মাথায় চলে গেলেও বাপন সারি সারি দাঁড়ানো মেয়েদের সামনে জড়সড় হয়ে বসেছিল আর জুলজুল করে তাকাচ্ছিল সবার দিকে। রিচার শরীরে বাপনের নজর একটু বেশীই ঘুরছিল। বাপন আর চয়েস করবে কি! রিচাই ওকে ডেকে নিয়েছিল নিজের ঘরে সেদিন।  

-“ফোনটা দে,” রিচার ওভাবে ফোন কেড়ে নেওয়া ভালো লাগেনি বাপনের। কড়া ভাষায় আরো কিছু বলতে গিয়েও রিচার মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল বাপন। গম্ভীর মুখে ভুরু কুঁচকে বাপনের মোবাইলের স্ক্রীনে ঋতিকা আর চঞ্চলের ছবিটা দেখছে রিচা।

(২)

-“বাব্বা! এতদিনে ফোন করলি তাহলে,” কণিষ্কর ফোন পেয়ে বাবলি বেশ উচ্ছ্বসিত। কলেজের বন্ধুদের মধ্যে বাবলির পি-আর প্রচণ্ড রকমের ভালো। গ্রুপের সবার সাথেই ফোন আর পার্সোনাল চ্যাটের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখে চলে। সকলের হাঁড়ির খবরও কমবেশী থাকে বাবলির কাছে। ঋতিকার সাথে কণিষ্কর নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সময়েই বন্ধুমহলে চঞ্চলের এইরকম আবির্ভাব কূ ডাকছিল কণিষ্কর মনে। 

কিছুদিন ধরে ঋতিকার দেখাও পাচ্ছে না। ঋতিকা অটো ধরতে আসে না ডানলপের স্ট্যাণ্ডে। কেন আসছে না ফোন করে ঋতিকার কাছে সেটা জানতে চাওয়ার সাহস কণিষ্ক জোটাতে পারেনি। এদিকে মনের অস্থিরতাও কাটছে না। বরানগর স্ট্যাণ্ডের প্রদীপের কাছেই একদিন শুনলো, ঋতিকা একজনের গাড়ীতে করে নাকি অফিসে যাচ্ছে আজকাল। লেকের মুখোমুখি বিল্ডিং কমপ্লেক্সে একজন থাকতে এসেছে কিছুদিন হল। গাড়ীতে করে অফিসে যাওয়ার সময় সেই ভদ্রলোক ঋতিকাকে বরানগর স্টপ থেকে তুলে নেয়। একদিন বাপন বরানগর স্টপ অন্ধি গিয়ে দেখে এসেছে। সন্দেহ তো একটা হচ্ছিলই। সেদিনের পরে সেটা দূর হল। গাড়ীর চালকের আসনে চঞ্চল বসে আছে। চঞ্চলের পাশে বসে ঋতিকাকে চলে যেতে দেখে বাপনের মনে হচ্ছিল ওর ভেতরটা কেউ গুঁড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। প্রদীপদের সাথে ওর দারু খেতে বসা সেইদিনই প্রথম। সেদিনই রিচার ঘরে প্রথমবার ঢুকেছিল বাপন। পরেরদিন বাবলিকে ফোন করেছিল সে। চঞ্চল আর ঋতিকার সম্পর্কের আপডেট জানতে চাইলে অনর্গল বকে গেছিল বাবলি। 

-“আর বলিস না! ঋতির কোনো আক্কেল আছে? ওই ডিভোর্সি চঞ্চল ছাড়া কি ওর গতি নেই? নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য চঞ্চল তো একবার ঋতিকে ছুঁড়ে ফেলেছিল। ফরেনারের সাথে জমেনি বেশিদিন, ফিরে এসে ঋতিকে ইনিয়ে বিনিয়ে নিজের দুখ্‌রা শুনিয়েছে! ব্যস ঋতির কাছে সব মাফ।” 

-“ঋতিকা চঞ্চলকে বিয়ে করবে নাকি?” যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল কণিষ্কর গলায়। 

-“জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঋতিকে। অত খুলে আমাকে কিছু বলেনি। তবে ঋতির হাবভাব দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। কি কাণ্ড বল দেখি!”

কিছুই না আবার হয়ত অনেক কিছু! বাপন নিজেকেই বুঝতে পারে না। ঋতিকা জীবনে যাই করুক তাতে বাপনের কিছুই বলার থাকতে পারে না। তবু সেদিন বাবলির সাথে কথা বলার পর থেকেই ওর মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। চঞ্চলের সাথে ঋতিকার সম্পর্কটা আবার আগের মত হয়ে যাচ্ছে ভাবলেই খুব কষ্ট হচ্ছে কণিষ্কর। যদিও ঋতিকা তো ওর কোনোদিনই হবে না, তাহলে!

-“আবে, এ ফান্টুস তোর জানেমনের সাথে পোজ দিচ্ছে কেন?” বাপনের মোবাইলের পর্দায় চঞ্চল আর ঋতিকার যুগল ছবিটা দেখে বলে ওঠে রিচা। 

-“হবু বর তো বৌয়ের সাথে পোজ দিয়ে ছবি তুলবেই। এতে আশ্চর্যের কী আছে?” গলা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে কথা বলছে বাপন।

-“কিছুই না। হবু বরটা এক নম্বরের ঢ্যামনা কিনা তাই জানতে চাইছি!”

-“কেন? চঞ্চল কী করেছে?” 

-“বলব। তার আগে বল তুই শুধু আমাকে নিয়ে যাবি এই ট্রিপে!” কথাটা শুনে রিচার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বাপন। ডানলপ চত্বরের রাতের রাণী রিচার চোখে আকূতি। রিচা চাইছে অন্তত একটিবার ঋতিকার মত ওকেও শুধু প্যাসেঞ্জার নিয়ে চলুক বাপন। একটুখানি তো চাহিদা! বাপন রাজী হয়ে গেল। অটোতে বাপনের পাশে বসে যেতে যেতে রিচা অনেক কথাই বলল। চোয়াল শক্ত করে শুনছিল বাপন। সেইসাথে মনের সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে বাপন কিছু করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হচ্ছিল।


(৩)

দিন কয়েক পরের কথা। সন্ধ্যে ছটা নাগাদ নোয়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে ঋতিকা বনহুগলি যাওয়ার অটো ধরল। আজ সকাল থেকে চঞ্চল বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত ছিল বলে ঋতিকা চঞ্চলের সাথে অফিস যায়নি। তবে এখন বাড়ীতে না ফিরে চঞ্চলের ফ্ল্যাটেই যাচ্ছে। ও ঠিক করেছে একসাথে ডিনার করবে। তবে চঞ্চলকে কিছু না জানিয়ে একটা সারপ্রাইজ দিতে চাইছে ঋতিকা। সেইসাথে মনের মধ্যে যে খচখচানি হচ্ছে সেটাও দূর করা যাবে।

ঋতিকাকে নিয়ে অটোটা স্ট্যাণ্ড থেকে বেরিয়ে গেলে অন্য অটোতে বসে থাকা প্রদীপ ফোন করল বাপনকে।

“বেরিয়ে গেছে বুঝলি। দশ মিনিটের মধ্যে স্পটে মানে বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছে যাবে।”

-“ঠিক আছে, আমি স্পটের পাশেই আছি।” বাপন আজ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ওর চিরাচরিত রুট ছেড়ে অন্য রুটের রাস্তায় এসেছে। রাস্তার ধারে ওর অটোকে সাইড করে রেখেছে। আর নিজে লেক ফেসিং যে আবাসনে চঞ্চল ফ্ল্যাট কিনেছে, তার পাশেই একটা ছোট গলির আবছা আঁধারে থেকে লক্ষ্য রাখছে আবাসনের মেইন গেটের দিকে। বোঝা যাচ্ছে কারো জন্য সে অপেক্ষা করছে। চঞ্চলকে সারপ্রাইজ দেওয়ার যে প্ল্যান ঋতিকা করেছিল সেটা এতক্ষণে আরও তিনজন জেনে গেছে। 

কিছুক্ষণ পরেই ঋতিকা বহুতল বিল্ডিং কমপ্লেক্সের মেইন গেটের সামনে অটো থেকে নামবে চঞ্চলের ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য। চঞ্চলের ফ্ল্যাটের বর্তমান পরিস্থিতিটা জানতে হলে আমাদের এক ঘন্টা পিছিয়ে যেতে হবে। ঠিক যখন চঞ্চলের ফ্ল্যাটের বেলটা বেজে উঠেছিল। দরজা খুলে তো চঞ্চল বেশ অবাক। মোহময়ী সাজে দরজার অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে রিচা। মেয়েটার মধ্যে পুরুষদের আকর্ষণ করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। ওর নেশায় একসময় বুঁদ হয়ে ছিল চঞ্চল। প্রায় দিনই চঞ্চল সায়রাবিবির আস্তানায় চলে যেত রিচার টানে। রিচা এই ফ্ল্যাটেও এসেছে। রিচার সাথে ঝামেলাটাও তো হল ফ্ল্যাটেই।

সেদিন রিচার শরীরটা আশ মিটিয়ে খাওয়ার পরে চঞ্চল ওকে প্রস্তাবটা দিয়েছিল। অনেক বেশী টাকা রোজগারের হাতছানি ছিল সেই প্রস্তাবে। কিন্তু রিচা রাজী হয়নি। এদিকে চঞ্চল পার্টির থেকে মোটা অ্যাডভান্স নিয়ে ফেলেছে, ক্রমাগত তাগাদা আসছে। আসলে রিচার সাথে একটা অ্যাটাচ্‌মেন্ট হয়ে গেছিল বলেই চালে ভুল করে ফেলেছিল চঞ্চল। প্রস্তাব না দিয়ে সোজাসুজি পার্টির হাতে তুলে দিলেই হয়ত ল্যাটা চুকে যেত। তবে রিচা লাইনের মেয়ে, বেশ চালাক-চতুরও। ওকে বোকা বানানো সহজ হত না। রিচাকে হ্যাণ্ডওভার করার পরে বয়স্ক লোকটার সাথে কিছু একটা করে বসলে বা পালিয়ে পুলিশের কাছে চলে গেলে চঞ্চল ফেঁসে যেতে পারতো। তাই রিচাকে জানিয়েই করতে চেয়েছিল। পুরো সওদা থেকে ভালোরকম ভাগই দিত রিচাকে। কিন্তু সব শুনে চঞ্চলকে গালি দিয়ে রিচা চলে গেছিল। তবে রিচাকে চঞ্চল বলেছিল মত বদলালে যেন ফিরে আসে।  

-“ভেবে দেখলাম তোর প্ল্যানটা খারাপ না। বুড়োটার খিদে মেটাতে হবে, এই তো! এখানেও করতে হয় সেসব। সাথে একটু যত্নআত্তিও করতে হবে নাহয়। বুড়োর তো ছেলেমেয়ে কেউ কাছে থাকে না বলেছিলি?”

-“হ্যাঁ, সবাই দেশের বাইরে। বুড়োটা তোকে বৌয়ের মতই রাখবে। ভালো খাওয়া-পরা পাবি, মুম্বাইয়ের অন্ধেরির মত পশ এলাকায় থাকবি। আর কি চাই!”

-“তোর দালালির টাকার আধা হিস্যা চাই আমার।”

-“ডান্‌! তাহলে কাল ভোরের ফ্লাইটেই টিকিট বুক করছি।” বেশ নিশ্চিন্ত লাগছে চঞ্চলের। রিচা ওকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। পার্টির অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব ছিল না ওর পক্ষে। বিকল্প একটা বন্দোবস্ত করার পথে কিছুটা এগোচ্ছিল, কিন্তু সেটাতেও রিস্ক অনেক। অনেক সাবধানে আর ধীরেসুস্থে পা ফেলতে হচ্ছিল চঞ্চলকে। সময় লাগছিল তাতে। এদিকে বৌয়ের মৃত্যুর পরে একাকীত্ব গ্রাস করছিল ওর ক্লায়েন্ট মুম্বাইনিবাসী বয়ষ্ক ভদ্রলোকটিকে। খুবই অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।  

-“রাতটা তাহলে এখানেই থেকে যাই।” শরীরী বিভঙ্গে নেশা ছড়িয়ে রিচা কথাটা ছুঁড়ে দিল চঞ্চলের দিকে। ও জানে চঞ্চল এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতছাড়া করার বান্দাই নয়। 

এরপরে বেডরুমে ঘন্টাখানেক উথালপাথাল সময় কাটতে কাটতেই আবার বেল বাজলো চঞ্চলের ফ্ল্যাটে। ঠিক সেইসময় কণিষ্ক অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে কমপ্লেক্সের মেইন গেটের সামনে অটো নিয়ে অপেক্ষা করছিল। ও জানে একটু বাদেই হৃদয়ভঙ্গের একরাশ বেদনা নিয়ে ঋতিকা বেরিয়ে আসবে।  

বাবলিকে ঋতিকা ওর ফিলিংস শেয়ার করে শুনে কণিষ্ক বাবলিকে রিকোয়েস্ট করেছিল যাতে ও ঋতিকাকে সাবধান করে চঞ্চলের ব্যাপারে। রিচাকে চঞ্চল কী প্রস্তাব দিয়েছিল সেটা আর কণিষ্কর অজানা নয় তখন। সেইসব কথা ঋতিকে সরাসরি না জানিয়ে বাবলি একটু ঘুরিয়ে বলেছিল। পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ার আগে ঋতি যেন চঞ্চলকে ভালোভাবে যাচাই করে নেয়। এই যে আজ ঋতিকার সারপ্রাইজ ডিনারের প্ল্যান, সেটা বাবলিরই মস্তিষ্কপ্রসূত। শুধু প্ল্যানের কথাটা যে বাবলি কণিষ্ককেও জানিয়েছে, সেটা ঋতি জানবে না কোনোদিনই। বাপনও সেইমত রিচাকে ফিট করল যাতে ঋতিকার সামনে চঞ্চলের কদর্য রূপটা সহজেই প্রকাশ হতে পারে। 

ওই তো ঋতিকা আসছে। পেছন পেছন চঞ্চলও আসছে যদিও। কিন্তু চঞ্চলের কোনো কথাই শুনছে না ঋতিকা। গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। সামনেই একটা অটো দেখে ঋতিকা এগিয়ে আসছে ওর দিকেই। অটোতে স্টার্ট দিল বাপন। 

ঋতিকার জীবনে অটোচালক বাপনের জন্য কোনো জায়গা না থাকলেও ও বন্ধুর মত একটা কাজ করেছে। চঞ্চলের নোংরা অভিসন্ধির আঁচ কোনোদিনই ঋতিকাকে স্পর্শ করবে না।